দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জে ইসলাম ও মুসলমান

 

আয়াজ আহমাদ বাঙালি: বিশ্বের ছোট-বড় অসংখ্য দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জে ইসলাম ও মুসলমানদের উপস্থিতি একেবারেই একরকম নয়—কোথাও শতভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ, কোথাও সংখ্যালঘু হলেও প্রভাবশালী, আবার কোথাও সংখ্যায় খুব কম হলেও ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজে মুসলিমদের গভীর ছাপ রয়েছে।

ভারত মহাসাগরের দ্বীপগুলোতে ইসলামের প্রবেশ ঘটেছে বহু আগে, মূলত আরব ও ভারতীয় বণিকদের মাধ্যমে। সেই ধারাবাহিকতায় মালদ্বীপ আজ বিশ্বের অন্যতম ছোট কিন্তু সম্পূর্ণ মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১১৯২টি ক্ষুদ্র দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই রাষ্ট্রে ৩৮০,০০০-র বেশি মুসলমান বসবাস করে। এই দেশে অমুসলিমদের নাগরিকত্ব দেওয়ার নিয়ম নেই; রাষ্ট্র, আইন ও সংস্কৃতি পুরোপুরি ইসলামী মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত। কোমোরোসে ৯৮ শতাংশেরও বেশি মানুষ মুসলমান। এটি আফ্রিকার উপকূলবর্তী একটি শক্তিশালী ইসলামী সমাজের উদাহরণ। অন্যদিকে সেশেলসে মুসলিম সংখ্যা খুবই কম, মাত্র হাজারখানেকের মতো।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপপুঞ্জ বা মালয় আর্কিপেলাগো হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম অধ্যুষিত দ্বীপ অঞ্চল। এখানে ইন্দোনেশিয়া এককভাবে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। প্রায় ৮৭ শতাংশ মানুষ মুসলমান। সংখ্যা প্রায় ২৪ কোটিরও বেশি। জাভা, সুমাত্রা, সুলাওয়েসি এবং কালিমান্তান ইত্যাদি দ্বীপে ইসলাম শত শত বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত। একইভাবে ব্রুনেই একটি ছোট এবং ধনী মুসলিম রাষ্ট্র। এদেশে প্রায় ৬৮ শতাংশ মুসলমান; রাষ্ট্রীয় আইন শরীয়াহভিত্তিক। মালয়েশিয়াতেও ৬০ শতাংশের বেশি মুসলমান। এখানকার মালয় উপদ্বীপ ও বোর্নিওর অংশ মিলিয়ে এক সমন্বিত ইসলামী সমাজ গড়ে উঠেছে।

এই অঞ্চলের বাইরে অনেক দ্বীপে মুসলমানরা সংখ্যালঘু হলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফিলিপাইনের মিন্দানাও ও সুলু দ্বীপপুঞ্জে “মোরো” মুসলিমরা সংখ্যায় কম (৪-৭ শতাংশ) হলেও ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী। ক্যারিবীয় অঞ্চলে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসেবে ভারতীয় ও আফ্রিকান মুসলমানদের আগমনের ফলে সুরিনাম (প্রায় ১৩%), ত্রিনিদাদ ও টোবাগো (৮%+) এবং গায়ানায় (১০–১৩%) উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনসংখ্যা গড়ে উঠেছে। অস্ট্রেলিয়ার কাছাকাছি ছোট দ্বীপগুলোতেও কিছু মুসলিম কমিউনিটি আছে, যদিও সংখ্যা কম।

প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোতে মুসলিম সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। মার্শাল আইল্যান্ডস, টুভালু, নাউরু এবং মাইক্রোনেশিয়াতে মুসলিম সংখ্যা মোটের ১০০ জনেরও কম। এর প্রধান কারণ ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং খ্রিস্টান মিশনারি কার্যক্রম।

অন্যদিকে কিছু দ্বীপ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জাঞ্জিবারে প্রায় শতভাগ মানুষ মুসলমান, যদিও এটি তানজানিয়ার অংশ। সাইপ্রাসের উত্তর অংশে তুর্কি সাইপ্রিয়টে মুসলিমরা বসবাস করে। ইউরোপের মাল্টাতে প্রায় ১০,০০০ মুসলিম রয়েছে, যাদের বেশিরভাগই অভিবাসী। যুক্তরাজ্যের দ্বীপাঞ্চলীয় শহরগুলোতে (লন্ডন, বার্মিংহাম) মুসলিমদের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে, মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬.৫%। আইসল্যান্ডে মুসলিম সংখ্যা খুবই কম (১,০০০-১,৫০০)।

আফ্রিকার দ্বীপগুলোর চিত্রও বৈচিত্র্যময়। মাদাগাস্কারে ৭-১৫% মুসলমান, মরিশাসে প্রায় ১৭.৩% মুসলিম এবং মায়োতে প্রায় ৯৭% মানুষ মুসলিম।

ওশেনিয়া অঞ্চলে ফিজিতে প্রায় ৭% মুসলমান, নিউজিল্যান্ডএ প্রায় ১.৩% এবং পাপুয়া নিউগিনিতে মুসলিম সংখ্যা খুবই কম হলেও ধীরে ধীরে বাড়ছে। আমেরিকার কাছাকাছি দ্বীপগুলোতে যেমন কিউবাতে প্রায় ১০,০০০ মুসলিম রয়েছে এবং বার্বাডোজ ও বাহামাতেও ছোট মুসলিম কমিউনিটি আছে।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপগুলোর মধ্যে লাক্ষাদ্বীপ সম্পূর্ণই মুসলিম অধ্যুষিত এবং সংস্কৃতিতে মালয়ালি ও আরব প্রভাব রয়েছে। শ্রীলঙ্কাতে প্রায় ৯.৭% মুসলমান, যারা “শ্রীলঙ্কান মুর” নামে পরিচিত।

আরও ছোট দ্বীপগুলোর মধ্যে রিইউনিয়ন দ্বীপে ৪-৫% মুসলিম, ক্রিসমাস আইল্যান্ডে ২০-২৫%, এবং কোকোস (কিলিং) দ্বীপপুঞ্জছ ৭৫-৮০% মুসলিম রয়েছে। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ৮-১০% মুসলিম, হাইনান দ্বীপে “উতসুল” মুসলিম গোষ্ঠী বাস করে। থাইল্যান্ডের ফুকেট ও কো চ্যাংয়ে স্থানীয় মালয় মুসলিম রয়েছে।

উত্তর আটলান্টিক ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের বারমুডাতে প্রায় ১% মুসলিম, গ্রেনাডা, ডোমিনিকাতেও ছোট মুসলিম সম্প্রদায় রয়েছে এবং পুয়ের্তো রিকোতে ৫,০০০-৮,০০০ মুসলিম বসবাস করে। ইউরোপীয় দ্বীপগুলোর মধ্যে ক্রিটে ঐতিহাসিক মুসলিম উপস্থিতি ছিল। ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে বর্তমানে অভিবাসীদের মাধ্যমে মুসলিম সংখ্যা বেড়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে দ্বীপগুলোতে ইসলাম ছড়িয়েছে তিনটি প্রধান পথে—বাণিজ্য, চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক পরিবহন এবং আধুনিক অভিবাসন। আরব ও পারস্যের বণিকরা সমুদ্রপথে ঘুরে দ্বীপে দ্বীপে ইসলামের বীজ বপন করেছেন; ঔপনিবেশিক যুগে ভারত ও জাভা থেকে শ্রমিকদের বিভিন্ন দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয়েছে; আধুনিক যুগে কর্মসংস্থানের জন্য মুসলিমরা ইউরোপ ও আমেরিকার দ্বীপগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে।

দ্বীপ অঞ্চলের মুসলমানদের জীবনযাত্রা তাদের ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ফিলিপাইনের মোরো মুসলিমরা শত শত বছর উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে। জাঞ্জিবারের মুসলিমরা ঐতিহাসিকভাবে দক্ষ নাবিক ও সমুদ্রযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। মালদ্বীপের মানুষ ছোট নৌকায় করে শক্তিশালী নৌবাহিনীকে প্রতিরোধ করার ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।

পেশাগত দিক থেকেও তারা বিশেষ। সামুদ্রিক মাছ ধরা, মুক্তা আহরণ, মশলা বাণিজ্য, নৌ-নির্মাণের ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। ইন্দোনেশিয়ার মালুকু দ্বীপপুঞ্জ থেকে মুসলিম বণিকরা বিশ্বে মশলার বাণিজ্য শুরু করেছিলেন। নৌ-বিদ্যায় ইবনে মজিদের মতো মুসলিম নাবিকরা আধুনিক মানচিত্র ও কম্পাস ব্যবহারের পথ দেখিয়েছেন।

স্থাপত্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য। মালদ্বীপের প্রবাল পাথরের মসজিদ, কাঠ ও নারকেল দিয়ে তৈরি স্থাপনা স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে গড়ে উঠেছে। অনেক দ্বীপে মসজিদের মিনার বাতিঘর হিসেবেও কাজ করেছে।

সাংস্কৃতিকভাবে ইসলাম স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গেছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় সুফি সাধকদের মাধ্যমে ইসলাম ছড়িয়েছে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে লোকজ সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটেছে। সোয়াহিলি ও মালয় ভাষায় আরবি প্রভাব গভীরভাবে লক্ষ্যণীয়।

বর্তমান যুগে দ্বীপের মুসলিমরা পরিবেশ রক্ষা, পর্যটন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মালদ্বীপের মতো দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থেকেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। হালাল পর্যটনের ধারণাও এসব দ্বীপ থেকেই জনপ্রিয় হয়েছে।

খাদ্যাভ্যাসে নারকেল ও সামুদ্রিক মাছ প্রধান, যেমন মালদ্বীপের “মাসহুনি”। উৎসবে নৌকা শোভাযাত্রা, পোশাকে সারং বা বাতিক স্থানীয় ও ইসলামী সংস্কৃতির মিশ্রণ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষ করে সুনামির মতো ঘটনাও মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে।

শিক্ষা ও সমাজেও অভিনব দিক রয়েছে—ভাসমান মাদরাসা, মাতৃতান্ত্রিক মুসলিম সমাজ (মিনাংকাবাউ) এবং পরিবেশ রক্ষায় ধর্মীয় ফতোয়া এক নতুন দৃষ্টান্ত। এমনকি অনেক দ্বীপে কিবলা নির্ধারণের জন্য নক্ষত্র ব্যবহার করা হতো, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশে ভূমিকা রেখেছে।

দ্বীপ অঞ্চলের মুসলিমদের বীরত্বের উদাহরণ হিসেবে ফিলিপাইনের মোরো মুসলিমদের ৪০০ বছরের প্রতিরোধ আন্দোলন উল্লেখযোগ্য। জাঞ্জিবারের মুসলিমরা ঐতিহাসিকভাবে দক্ষ নাবিক ও সমুদ্রযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ছিল। মালদ্বীপে মুহাম্মদ ঠাকুরফানুর নেতৃত্বে পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম দ্বীপবাসীরা মুক্তা শিকার, সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ এবং মশলা বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে–বিশেষ করে মালুকু দ্বীপপুঞ্জের লবঙ্গ ও জায়ফল বিশ্বব্যাপী পরিচিত। নৌ-নির্মাণে তাদের দক্ষতা, বিশেষ করে “ডিঙ্গি” নৌকা, সমুদ্রযাত্রায় অত্যন্ত কার্যকর ছিল।

নৌ-নেভিগেশনে ইবনে মাজিদের অবদান উল্লেখযোগ্য, যিনি সমুদ্রপথ নির্ধারণে পথপ্রদর্শক ছিলেন। মালদ্বীপে প্রবাল পাথরের তৈরি মসজিদ স্থাপত্য এক অনন্য ঐতিহ্য, যেখানে সূক্ষ্ম কারুকাজ দেখা যায়। ইন্দোনেশিয়ায় “ওয়ালি সাঙ্গো” সুফিদের মাধ্যমে ইসলাম বিস্তার লাভ করে। সোয়াহিলি ও মালয় ভাষায় আরবি প্রভাব গভীরভাবে বিদ্যমান।

দ্বীপ অঞ্চলে মুসলিমদের খাদ্যাভ্যাসে নারকেল ও সামুদ্রিক মাছের আধিক্য দেখা যায়। ধর্মীয় উৎসবগুলোতে নৌকা শোভাযাত্রা একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পোশাকে সারং ও বাতিক সংস্কৃতি জনপ্রিয়। ২০০৪ সালের সুনামির সময় আচেহ অঞ্চলে অনেক মসজিদ অক্ষত থাকার ঘটনা মানুষের বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে। ভাসমান মাদরাসা বা ‘বোট স্কুল’ শিক্ষার এক অভিনব মাধ্যম। ইন্দোনেশিয়ার মিনাংকাবাউ মুসলিমরা বিশ্বের বৃহত্তম মাতৃতান্ত্রিক সমাজ। মালদ্বীপ বর্তমানে হালাল হানিমুন গন্তব্য হিসেবে বিশ্বে পরিচিত। প্রশান্ত মহাসাগরীয় কিছু দ্বীপে রমজানের সময় নির্ধারণে ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ দেখা যায়।

প্রাচীন দ্বীপবাসীরা নক্ষত্র দেখে কিবলা নির্ধারণ করত। কিছু অঞ্চলে ভাসমান মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। আচেহ ও পাসাই অঞ্চলে নারী সুলতানদের শাসন ছিল উল্লেখযোগ্য। অনেক মসজিদের মিনার বাতিঘর হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় “জাউই”  লিপি ব্যবহার করা হতো, যা আরবি অক্ষরে মালয় ভাষা লেখার একটি পদ্ধতি। সমুদ্রভিত্তিক পুঁথি সাহিত্যও সেখানে প্রচলিত ছিল।

সেন্টিনেল দ্বীপ আরব মানচিত্রে উল্লেখ থাকলেও আজও বিচ্ছিন্ন। ইস্টার আইল্যান্ডে সীমিত পরিসরে ইসলাম চর্চা শুরু হয়েছে। মানসা মুসার নৌ-অভিযান নিয়ে বিতর্কিত ধারণা রয়েছে যে মুসলিমরা আমেরিকায় আগে পৌঁছেছিল। রবিনসন ক্রুসো দ্বীপে মুসলিম নাবিকদের কবরের সন্ধান পাওয়া যায়। কানাডার কিছু দ্বীপে মুসলিম কাঠুরেদের নামাজের লোককথা প্রচলিত। ওকিনাওয়ায় মুসলিম সৈনিকদের প্রভাবের ইতিহাসও রয়েছে।

আয়ারল্যান্ডের শেরকিন দ্বীপে বারবারি মুসলিম জলদস্যুদের বসতির সম্ভাবনার কথা লোককথায় পাওয়া যায়। জাপানের কোবেতে একটি মসজিদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞেও অক্ষত ছিল। মাদাগাস্কারে “সোরাবে” নামে আরবি অক্ষরে লেখা একটি প্রাচীন লিপি রয়েছে। গোরি দ্বীপে দাস মুসলিমরা কুরআন তিলাওয়াত করে মনোবল ধরে রাখত। টাইটানিক জাহাজেও কিছু মুসলিম যাত্রী ছিলেন।

লক্ষদ্বীপে নারীরা প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী ছিল। দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলে মুসলিমরা সময়ের তারতম্যের কারণে ভিন্নভাবে রোজা ও নামাজ পালন করে। ফিলিপাইনের মুসলিমরা দক্ষ মুক্তা ডুবুরি হিসেবে পরিচিত ছিল। কিছু দ্বীপে বিড়ালকে বিশেষভাবে লালন করা হয় ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাবে। কেপ ভার্দেতে নির্বাসিত মুসলিম পণ্ডিতদের প্রভাব রয়েছে। সাইপ্রাসে “হালা সুলতান টেক্কে” একটি ঐতিহাসিক ইসলামিক স্থাপনা। সাও তোমে দ্বীপে গোপনে ইসলাম চর্চার ইতিহাস রয়েছে। ‘কামাল’ নামক যন্ত্র দিয়ে নক্ষত্রভিত্তিক নেভিগেশন করা হতো। জাঞ্জিবারের লবঙ্গ অর্থনীতি বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বিশ্বের বিভিন্ন দ্বীপের মুসলমানরা ইতিহাস, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও আধ্যাত্মিকতায় এক বিশাল ও বৈচিত্র্যময় বাস্তবতা তৈরি করেছে। কোথাও সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, কোথাও সংখ্যালঘু হয়েও সমাজে প্রভাব রাখছে, আবার কোথাও খুব কম সংখ্যায় থেকেও নিজেদের বিশ্বাস ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছে।

ইউরোপে ইসলামের বিস্তার

ইউরোপের চিত্র কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। এখানে ইসলাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ অভিবাসন। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, ১৯৯০ সালে ইউরোপে (তুরস্ক বাদে) মুসলিম জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩ কোটি, যা ২০১০ সালে বেড়ে হয়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ। মোট জনসংখ্যায় মুসলিমদের অংশ ১৯৯০ সালের ৪.১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১০ সালে ৬ শতাংশ হয়েছে।

ফ্রান্সে বর্তমানে প্রায় ৫৭ লাখ মুসলিম বাস করছেন, জার্মানিতে প্রায় ৫০ লাখ এবং যুক্তরাজ্যে ২০২১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ৩৫ লাখ। সিরিয়া, আফগানিস্তান এবং অন্যান্য মুসলিম দেশ থেকে শরণার্থীদের আগমন এই সংখ্যাকে আরও বাড়িয়েছে। ইউরোপে মুসলিমদের মধ্যক বয়স অমুসলিম ইউরোপীয়দের চেয়ে প্রায় ১৩ বছর কম, যা ভবিষ্যতে আরও বড় প্রজনন শক্তির ইঙ্গিত দেয়।

ইউরোপজুড়ে ইসলাম ও মুসলমান

ইউরোপে ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাস সভ্যতার আদান-প্রদান, রাজনৈতিক পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন এবং আধুনিক সমাজের রূপান্তরের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত ইউরোপের সাথে ইসলামের সম্পর্ক কখনও সংঘর্ষের, কখনও সহাবস্থানের, আবার কখনও বা গভীর সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।

ইউরোপে মুসলমানদের উপস্থিতি আজকে নতুন মনে হলেও এর শিকড় বহু পুরনো। স্পেন ও পর্তুগালের আল-আন্দালুস অঞ্চলে প্রায় আট শতাব্দী ধরে মুসলিম শাসন ছিল, যার ফলে গ্রানাডা, কর্ডোভা এবং সেভিলের মতো শহরগুলো জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসা, দর্শন ও স্থাপত্যে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে। আলহামরা প্রাসাদ এবং কর্ডোভার মসজিদ-ক্যাথেড্রাল সেই সময়ের স্থাপত্য ও সংস্কৃতির জীবন্ত সাক্ষী। একইভাবে বলকান অঞ্চলে অটোমান সাম্রাজ্যের দীর্ঘ শাসন বসনিয়া, আলবেনিয়া এবং কসোভোসহ বহু এলাকায় ইসলামকে স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ করে তুলেছে। এই অঞ্চলের মুসলমানরা শতাব্দীপ্রাচীন স্থানীয় জনগোষ্ঠী।

আধুনিক ইউরোপে মুসলিম জনসংখ্যা মূলত তিনটি উৎস থেকে গঠিত হয়েছে। প্রথমত, ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কারণে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং নেদারল্যান্ডসের মতো দেশে উত্তর আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চল থেকে মানুষ এসেছে। দ্বিতীয়ত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শ্রমিক সংকট পূরণ করতে তুরস্ক, মরক্কো এবং পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যাপক অভিবাসন ঘটে। তৃতীয়ত, সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়া, আফগানিস্তান এবং ইরাকসহ বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে শরণার্থীর আগমন ইউরোপের মুসলিম জনসংখ্যা আরও বাড়িয়েছে।

আজ ইউরোপে প্রায় চার থেকে পাঁচ কোটি মুসলমান বাস করেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি। তবে এই সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে বলে জনমিতিক গবেষণায় বলা হয়। ফ্রান্সে ইউরোপের সবচেয়ে বড় মুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের বড় অংশ উত্তর আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। জার্মানিতে তুর্কি সম্প্রদায় সবচেয়ে বড় মুসলিম গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। যুক্তরাজ্যে দক্ষিণ এশীয় মুসলিমরা, বিশেষ করে পাকিস্তান ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা গুরুত্বপূর্ণ অংশ গঠন করে। লন্ডনের মতো শহরে মুসলিম সমাজ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান প্রভাব তৈরি করেছে, যার একটি উদাহরণ সাদিক খান।

 

দক্ষিণ ইউরোপে ইতালি ও স্পেনের পরিস্থিতি আলাদা। এখানে মুসলমানরা তুলনামূলকভাবে নতুন অভিবাসী হলেও ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলগুলোতে ইসলামের গভীর ছাপ রয়েছে। ইতালির সিসিলি দ্বীপ একসময় মুসলিম শাসনের অধীনে ছিল। আজও সেখানে আরবি ভাষা ও স্থাপত্যের প্রভাব দেখা যায়। স্পেনে মুসলিম ইতিহাসের স্মৃতি স্থাপত্যেই নয়, ভাষা ও সাংস্কৃতিক শব্দভাণ্ডারেও রয়ে গেছে।

বলকান অঞ্চলে আলবেনিয়া ইউরোপের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং কসোভোতে মুসলিম জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য এবং তারা ইউরোপীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর ভেতরেই নিজেদের পরিচয় ধরে রেখেছে। সারায়েভোর মতো শহরে মসজিদ, গির্জা এবং সিনাগগ পাশাপাশি অবস্থান করে ইউরোপের বহুত্ববাদী ইতিহাসের প্রতীক হয়ে আছে।

উত্তর ইউরোপে, বিশেষ করে সুইডেন, নরওয়ে ও ডেনমার্কে মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে মূলত অভিবাসনের কারণে। সুইডেনে অভিবাসন মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হয়। তবে এখানকার সামাজিক বাস্তবতা জটিল, কারণ একদিকে সংহতির প্রচেষ্টা রয়েছে, অন্যদিকে অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক প্রবণতা এবং ধর্মীয় পোশাক নিয়ে বিতর্কও রয়েছে।ফ্রান্সের কঠোর ধর্মনিরপেক্ষ নীতি হিজাবসহ ধর্মীয় প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের জন্ম দিয়ে আসছে।

পূর্ব ইউরোপ ও রাশিয়ায় মুসলিম জনসংখ্যা ঐতিহাসিকভাবে স্থানীয়। রাশিয়ায় প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি মুসলমান বাস করে, বিশেষ করে তাতারস্তান ও উত্তর ককেশাস অঞ্চলে। এই জনগোষ্ঠী রাশিয়ার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর অংশ। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়ার মতো দেশে মুসলমানদের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও সেখানে প্রাচীন তাতার সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য বিদ্যমান।

ইউরোপে মুসলিম সমাজের একটি বড় পরিবর্তন এসেছে অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। হালাল খাদ্য শিল্প এখন কয়েক বিলিয়ন ইউরোর বাজারে পরিণত হয়েছে। সুপারমার্কেট, রেস্তোরাঁ এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় হালাল পণ্য সাধারণ হয়ে উঠছে। লন্ডন হালাল ফিন্যান্স ও ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়েছে। একইভাবে হালাল পর্যটন, মডেস্ট ফ্যাশন এবং হালাল কসমেটিকসও বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মুসলিমদের প্রভাব ফুটবল, সংগীত এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে স্পষ্ট। মুহাম্মাদ সালাহ, করিম বেনজিমা, পগবা এবং সাদিও মানের মতো খেলোয়াড়রা ইউরোপীয় ক্রীড়াজগতে মুসলিম পরিচয়ের দৃশ্যমান প্রতীক। অনেক স্টেডিয়ামে রোজার সময় ইফতারের জন্য বিরতি দেওয়া হয়। খাবারের ক্ষেত্রেও ডোনার কাবাব বা চিকেন টিক্কা মাসালার মতো খাবার ইউরোপীয় খাদ্যসংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে।

একই সঙ্গে ইউরোপে মুসলিমদের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে।ইসলামোফোবিয়া, ডানপন্থী রাজনৈতিক প্রবণতা, হিজাব ও ধর্মীয় প্রতীক নিয়ে আইনগত বিতর্ক এবং অভিবাসন সংকট ইউরোপের সমাজকে জটিল করে তুলেছে।বিশেষ করে শরণার্থী প্রবাহের কারণে কিছু দেশে রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র হয়েছে।

তবে এর বিপরীতে একটি ইতিবাচক প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। ইউরোপের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্রে ইসলামিক স্টাডিজ ও ইমাম প্রশিক্ষণ চালু হয়েছে, যাতে স্থানীয় প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় নেতৃত্ব তৈরি করা যায়। ক্যামব্রিজ ও অক্সফোর্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক চিন্তাধারা নিয়ে গবেষণা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে ধর্ম ও সমাজের মধ্যে নতুন সেতুবন্ধন তৈরি করছেন।

আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে আসা অভিবাসীদের পাশাপাশি স্থানীয় মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা ইউরোপে একটি নতুন চিন্তাধারা তৈরি করছেন, যাকে অনেকেই “ইউরোপীয় ইসলাম” হিসেবে উল্লেখ করেন। এটি ধর্মীয় পরিচয় ও ইউরোপীয় নাগরিকত্বের মধ্যে সমন্বয়ের একটি চেষ্টা।

চীনের চিত্র

চীনে ইসলামের চর্চা চলছে সপ্তম শতাব্দী থেকে। ২০২০ সালের জাতীয় জনগণনা অনুযায়ী চীনে প্রায় ২ কোটি ৫৯ লাখ মুসলিম বাস করছেন, যা মোট জনসংখ্যার ২ শতাংশেরও কম। চীনের মুসলিমদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দুটি দল হলো উইঘুর এবং হুই। উল্লেখ্য, চীনে উইঘুর ও হুই ছাড়াও আরও ৮টি সরকারিভাবে স্বীকৃত সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম হিসেবে পরিচিতি আছে। চীনে মোট ১০টি মুসলিম-প্রধান নৃগোষ্ঠীর বসবাস। উইঘুর ও হুই বাদে বাকি গোষ্ঠীগুলো হলো—কাজাখ, ডংজিয়াং, কিরগিজ, সালার, তাজিক, উজবেক, বোনান এবং তাতার। কাজাখরা মূলত শিন-জিয়াং অঞ্চলে বসবাসকারী তুর্কি বংশোদ্ভূত, যাদের সংখ্যা প্রায় ১৪ লক্ষ। ডংজিয়াংরা প্রধানত গান-সু প্রদেশে বাস করে; তারা মঙ্গলীয় বংশোদ্ভূত এবং সংখ্যা ৬ লক্ষের বেশি। কিরগিজরাও সিনজিয়াংয়ে বসবাস করে, তাদের জনসংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার। সালাররা চিং-হাই ও গাঁসু অঞ্চলে বসবাসকারী তুর্কি ভাষাভাষী গোষ্ঠী। তাজিকরা সিনজিয়াংয়ের পামির পর্বতমালায় বসবাস করে, ফারসি ভাষায় কথা বলে এবং তাদের সংখ্যা প্রায় ৫১ হাজার। উজবেকরা সিনজিয়াংয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে, তাদের সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার। বোনানরা গাঁসু প্রদেশের একটি ছোট গোষ্ঠী, যাদের সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। তাতাররা সবচেয়ে ক্ষুদ্র মুসলিম নৃগোষ্ঠীগুলোর একটি, যাদের সংখ্যা মাত্র ৫ হাজার বা কিছু বেশি। এছাড়াও তিব্বতীয় মুসলিমদের একটি ছোট অংশ রয়েছে, তবে তারা আলাদা নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃত নয়; বরং তিব্বতীয় হিসেবেই গণ্য করা হয়।

গত দশকে চীনে মুসলিম সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ হান জনগোষ্ঠীর চেয়ে দ্রুত বেড়েছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সালের জনগণনার মধ্যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠীর প্রাপ্তবয়স্ক সংখ্যা ৯ শতাংশ বেড়ে ১৭৯ লাখে পৌঁছেছে, যেখানে হান জনগোষ্ঠী বেড়েছে মাত্র ৫ শতাংশ।

চীনের রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় ইসলামের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থনমূলক নয় বলে অনেক বিশ্লেষণে দেখা যায়। ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে সকল প্রধান মসজিদকে ‘সিনিফাই’ বা চীনাকরণ নীতিতে রূপান্তর করা হয়েছে। উইঘুর মুসলিমদের উপর চীন সরকারের দমনপীড়ন আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *