জনি সিদ্দিক: কালের স্রোতে ইতিহাস বাঁক নেয়, শোষণের রূপ বদলায়, কিন্তু মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষা থাকে অটুট। ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু সংগ্রাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সাহস ও আত্মমর্যাদার বার্তা বহন করে। তেমনি একটি অদম্য চেতনার নাম হলো সৈয়দ মীর নিসার আলী, যিনি ইতিহাসে তিতুমীর নামে পরিচিত। ঊনবিংশ শতকে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিদ্রোহের প্রতীক ছিল ‘বাঁশেরকেল্লা’। এটি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির ইস্পাতদৃঢ় ক্ষমতার বিপরীতে শোষিত কৃষকের সম্মিলিত সংকল্পের প্রতিচ্ছবি। বহু শতক পরে, সেই একই মুক্তির স্পৃহা একবিংশ শতকে আমরা দেখতে পাই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের নিরস্ত্র গণ-প্রতিরোধে। এই দুই ভিন্ন সময়ের আন্দোলন, একটি সশস্ত্র ও অপরটি অহিংস। আপাতদৃষ্টিতে পৃথক হলেও, এদের মূলে রয়েছে অন্যায়, শোষণ এবং কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ, যা একটি মহৎ চেতনার পরম্পরাকেই নির্দেশ করে। নিম্নে আমি বাঁশের কেল্লা থেকে জুলাই আন্দোলন কে কয়েকটি পর্বে বিভক্ত করে বর্ণনা করবো ইনশাআল্লাহ।
প্রথম পর্ব: তিতুমীর ও বাঁশের কেল্লা:শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম বলিষ্ঠ ঘোষণা
তিতুমীরের নেতৃত্বে ১৮৩০-৩১ সালের বিদ্রোহ ছিল ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলার কৃষক-জনতার এক প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখা। এই বিদ্রোহের মূল কারণ ছিল ব্রিটিশ প্রশাসন এবং তাদের মদদপুষ্ট অত্যাচারী স্থানীয় জমিদার ও নীলকরদের দ্বৈত শোষণ ও নির্মমতা। জমিদাররা দরিদ্র মুসলমান কৃষকদের উপর ‘দাঁড়ির খাজনা’র মতো অযৌক্তিক কর আরোপ করত, যা ছিল অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতাতেও হস্তক্ষেপ। এই অনাচারে জর্জরিত নিপীড়িত জনসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে তিতুমীর সর্বপ্রথম বুঝিয়েছিলেন যে, শৃঙ্খল ভাঙতে হলে প্রয়োজন সম্মিলিত শক্তি এবং আত্মমর্যাদার পুনরুজ্জীবন। বাঁশের কেল্লার প্রতীকী তাৎপর্য ও মহৎ আত্মত্যাগ বারাসাত অঞ্চলের নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে (২৩ অক্টোবর ১৮৩১) তিতুমীর যে বাঁশ ও কাদা দিয়ে দ্বি-স্তর বিশিষ্ট কেল্লাটি নির্মাণ করেছিলেন, তা নিছক একটি সামরিক দুর্গই ছিলোনা শুধু। বরং এটি ছিল ঔপনিবেশিক শক্তির অত্যাধুনিক কামানের বিপরীতে দেশীয় সম্পদের ওপর নির্ভর করে গড়ে তোলা সাধারণ মানুষের দৃঢ় আত্মবিশ্বাস ও সংহতির প্রতীকী দুর্গ। বাঁশের কেল্লা শিখিয়েছিল “শক্তি-সামর্থ্যে দুর্বল হলেও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস যদি থাকে, তবে সাধারণ উপকরণও প্রতিরোধের হাতিয়ার হতে পারে।”
তিতুমীর জানতেন, ব্রিটিশদের আধুনিক গোলার মুখে এই কেল্লার পতন অনিবার্য। কিন্তু তাঁর এই প্রতিরোধ ছিল ইতিহাসের পাতায় এক অবিস্মরণীয় আত্মাহুতি। ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর ব্রিটিশ বাহিনীর কামানের গোলায় কেল্লাটি ধ্বংস হয় এবং তিতুমীর শহীদ হন। তাঁর এই আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক শৃঙ্খলমুক্তির বীজমন্ত্র রোপণ করে গেল। তাঁর বিদ্রোহ ছিল কেবল অর্থনৈতিক মুক্তি নয়, বরং আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতা অর্জনের আদিপাঠ।
দ্বিতীয় পর্ব: সময়ের ব্যবধানে চেতনার রূপান্তর: জুলাইয়ের নিরস্ত্র জনতার উত্থান
কালের স্রোতে শাসন-শোষণের পদ্ধতি পাল্টেছে, জমিদারদের জায়গা নিয়েছে প্রশাসনিক দুর্নীতি ও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রযন্ত্র। কিন্তু শোষিত মানুষের বেদনা ও ন্যায়ের আকাক্সক্ষা রয়ে গেছে চিরন্তন। সেই একই মুক্তির আকুতি নিয়ে একুশ শতকের বুকে আছড়ে পড়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, যা দ্রুত বৃহত্তর নিরস্ত্র গণ-প্রতিরোধে রূপ নেয়। এই আন্দোলন ছিল মূলত সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ। কিন্তু যখন রাষ্ট্রযন্ত্র সেই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে বলপ্রয়োগ, দমন-পীড়ন এবং রক্তপাতের মাধ্যমে স্তব্ধ করতে চাইল, তখন তা কেবল কোটা আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। এই প্রতিরোধ পরিণত হলো কর্তৃত্ববাদ, দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় অনাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকদের সম্মিলিত নৈতিক প্রতিবাদের সর্বোচ্চ উচ্চারণে। ছাত্র-জনতা, শ্রমিক-কৃষক নির্বিশেষে আপামর জনতা সেদিন একতার দুর্গ গড়ে তুলেছিল। জুলাইয়ের প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল এর নিরস্ত্র সংগ্রাম এবং জনগণের অহিংস অসহযোগের পথ বেছে নেওয়া। তাদের হাতে ছিল না কোনো কামান বা বন্দুক, ছিল না তিতুমীরের মতো কোনো কাঠামোগত কেল্লা। তাদের অস্ত্র ছিল দৃঢ় মনোবল, সংহতির ঐক্যবদ্ধ উচ্চারণ এবং সত্যের প্রতি অবিচল আস্থা।
নিরস্ত্র প্রতিরোধ প্রমাণ করে যে, প্রকৃত শক্তি অস্ত্রের উপর নির্ভর করে না, তা নির্ভর করে গণচেতনা, নৈতিকতা এবং একতাবদ্ধ ইচ্ছাশক্তির উপর। এই আন্দোলন প্রমাণ করেছে, যখন একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করার চেষ্টা করে, তখন জনতা তাদের একতাই সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। অহিংস প্রতিবাদের এই পথ, যা মহাত্মা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা বা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের মতো ব্যক্তিত্বরা দেখিয়েছেন। তা আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের নৈতিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাবার এক শক্তিশালী উপায়। শত সহস্র শহীদের রক্ত, যার মধ্যে শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, শিশু রিয়া গোপ -এর আত্মত্যাগও রয়েছে। নাম না জানা ছোট শিশু থেকে তরুণ, বৃদ্ধ শত শত শহীদদের আত্মত্যাগ এই আন্দোলনকে এক ঐতিহাসিক মহিমা দান করেছে।
তৃতীয় পর্ব: চেতনার সেতু ও মুক্তির আকাক্সক্ষার যোগসূত্র
তিতুমীরের বাঁশেরকেল্লা এবং জুলাইয়ের নিরস্ত্র জনতার প্রতিরোধের মধ্যে একটি অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী চেতনার সেতু বিদ্যমান। এই যোগসূত্রকে নিম্নোক্ত কয়েকটি মানদণ্ডে বিচার করা যায়:
✓শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ:
উভয় সংগ্রামের মূল কারণ হলো কোনো না কোনো ধরনের শোষণ, বৈষম্য বা জুলুমের শিকার হওয়া। ১৯ শতকে তা ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণ; আধুনিক যুগে তা রূপ নিয়েছে প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং অধিকার হরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
✓সাধারণ মানুষের নেতৃত্ব:
উভয় ক্ষেত্রেই আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে গতি পেয়েছে। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের ইন্ধনে শুরু হয়নি, বরং মাটি ও মানুষের চাহিদা থেকে জন্ম নিয়েছিল। দল মত নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণ এতে যোগ দিয়েছেন।
✓আত্মবলিদান ও অদম্য স্পৃহা:
বাঁশের কেল্লায় আত্মবলিদানের মাধ্যমে তিতুমীর যে সাহসের বীজ বপন করেছিলেন, জুলাইয়ের জনতা তাদের ভয়কে জয় করে রাস্তায় নেমে আসার মাধ্যমে সেই সাহসেরই উত্তরাধিকারী হয়েছে। দুটি ঘটনাই প্রমাণ করে, মুক্তির জন্য মানুষ শেষ রক্তবিন্দু দিতেও প্রস্তুত। নানা রকম আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরস্ত্র জনতার সংগ্রাম সেটাই প্রমাণ করে।
✓চূড়ান্ত লক্ষ্য:
চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল একটি ন্যায় ও সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। যেখানে মানুষ শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে বাঁচতে পারবে, তাদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং বৈষম্য থাকবে না। এই লক্ষ্যেই তিতুমীরের কেল্লা আর জুলাইয়ের স্লোগান এক বিন্দুতে মিলে যায়।
উপসংহার:
তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা এক মহৎ ইতিহাসের সূচনা করেছিল সেটি হলো ভয়কে জয় করে মাথা তুলে দাঁড়ানোর ইতিহাস। সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে আধুনিক সমাজের নিরস্ত্র জনতা। বাঁশের কেল্লা আজ হয়তো সশরীরে নেই, কিন্তু তার অদম্য স্পৃহার অনির্বাণ শিখা আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে এক চেতনার অদৃশ্য দুর্গ গড়ে তুলেছে। এই সংগ্রামগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি জাতির সত্যিকারের অগ্রগতি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সূচকে পরিমাপ করা যায় না, বরং তা পরিমাপ করা হয় মানুষের ন্যায়ের জন্য রুখে দাঁড়ানোর নৈতিক ও মানবিক সামর্থ্য দিয়ে। প্রতিরোধ কখনও ফুরিয়ে যায় না, তার রূপ পরিবর্তিত হয় মাত্র। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা তাই জুলাইয়ের নিরস্ত্র জনতার চেতনার মধ্যে দিয়ে এক চিরন্তন সংগ্রামের প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে। এই সংগ্রাম হলো মানুষের আত্মমর্যাদা এবং গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার। যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়ে চলেছে, শৃঙ্খলমুক্তির সুমহান বার্তা নিয়ে।
মো: আবু বক্কার সিদ্দিক জনি, সালনা, গাজীপুর। পেশা: বেসরকারি চাকরি।