বাংলাদেশী ডায়াস্পোরা ইন সিডনির আয়োজনে দুই দিনব্যাপী প্রদর্শনী ‘জুলাই ’২৪: একটি প্রজন্মের গল্প সম্পন্ন

সুপ্রভাত সিডনি রিপোর্ট: সিডনিতে সফলভাবে সম্পন্ন হলো দুই দিনব্যাপী প্রদর্শনী “জুলাই ’২৪: একটি প্রজন্মের গল্প”। ‘বাংলাদেশী ডায়াস্পোরা ইন সিডনি’ আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশী ও অস্ট্রেলিয়ান কমিউনিটির সদস্যরা একত্রিত হয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাবলি স্মরণ করেন। তাঁরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী সময় থেকে উদ্ভূত আশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটান।

এই প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ ও মানুষের অভিজ্ঞতাকে এমনভাবে তুলে ধরা, যাতে আগামী প্রজন্ম শুধু ইতিহাসই নয়, বরং এর পেছনের সাহসিকতা, প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের গল্পও উপলব্ধি করতে পারে।

একটি সুবিন্যস্ত কালানুক্রমিক সময়রেখার (টাইমলাইন) মাধ্যমে প্রদর্শনীতে আন্দোলনের সূচনা ও ক্রমবিকাশ তুলে ধরা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক-পেশাজীবী শ্রেণি এবং টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া , বাংলাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়া সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধ ও সংহতির চিত্র এতে উঠে আসে।

একই সাথে প্রদর্শনীতে সেই সময়ের নির্মম সহিংসতার চিত্রও স্থান পায়। নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী হাসিনার প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ এবং দমন-পীড়নের মানবিক পরিণতি ফুটিয়ে তোলা হয়। সময়রেখার সমাপ্তি ঘটে ৫ আগস্ট ২০২৪-এর চূড়ান্ত বিজয়ের মুহূর্তের ছবি এবং চিহ্নিত শহীদদের তালিকার মাধ্যমে। পাশাপাশি বহু মানুষের নিখোঁজ থাকা এবং অসংখ্য ব্যক্তির আজীবন পঙ্গুত্ব বরণের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।

প্রদর্শনীর শেষ অংশে ছিল একটি ‘স্মৃতি দেয়াল’ ও ‘কমিউনিটি রিফ্লেকশন বোর্ড’। এর মাধ্যমে দর্শনার্থীরা শহীদদের স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য তাঁদের সংহতি, আশাবাদ ও নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করার সুযোগ পান।

গাইডেড ট্যুরের পাশাপাশি প্রদর্শনীতে যাত্রাবাড়ী গণহত্যা নিয়ে তৈরি একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়, যা গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নৃশংস সহিংসতাকে তুলে ধরে। এছাড়া “জুলাই স্টোরি” সিরিজের বিভিন্ন পর্ব প্রদর্শন করা হয়, যেখানে আন্দোলনকারী আহত ও বেঁচে যাওয়া বীরদের সরাসরি সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হয়েছিল। এতে ঐতিহাসিক সত্যের সাথে প্রত্যক্ষদর্শীদের বাস্তব জীবনের যোগসূত্র তৈরি হয়।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম শীর্ষনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, যিনি ২০২৪ সালের আগস্টে ঐতিহাসিক “লং মার্চ টু ঢাকা”র ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বর্তমানে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (NCP)-র মুখপাত্র হিসেবে কর্মরত। তিনি তাঁর বক্তব্যে জুলাই আন্দোলনের তাৎপর্য, তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে প্রবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।

প্রদর্শনীটি রাজনৈতিক প্রতিনিধি, মানবাধিকার আইনজীবী, লেখক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও সামাজিক নেতাদের এক অপূর্ব মিলনমেলায় পরিণত হয়। অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নিউ সাউথ ওয়েলসের গ্রিনস সিনেটর ও সাবেক ব্যরিস্টার ডেভিড শুব্রিজ, যিনি দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও সরকারের জবাবদিহিতা নিয়ে কাজ করছেন। আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক অস্ট্রেলিয়ান গ্রিনস সিনেটর লি রিয়ানন, যিনি শান্তি, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আন্দোলনের সাথে বহু বছর ধরে যুক্ত।

এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন ‘Human Rights for All’-এর পরিচালক অ্যালিসন ব্যাটিসন এবং ‘AMICA Veritas’-এর প্রধান আইনজীবী জাকি ওমর। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের নৃশংসতার আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপে এই দুজনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। জাকি ওমরের নির্দেশনায় অ্যালিসন ব্যাটিসন ১ আগস্ট ২০২৪ তারিখে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) ১৭ জুলাই থেকে ১ আগস্টের মধ্যে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রাথমিক তদন্তের আহ্বান জানিয়ে অভিযোগ দাখিল করেছিলেন। তাঁদের উপস্থিতি প্রদর্শনীতে আইন ও জবাবদিহিতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন প্রযুক্তিবিদ ও বিশিষ্ট লেখক এএসএম মাহবুব মুর্শেদ, যাঁর কাজ ও চিন্তাধারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশী ডায়াস্পোরার সাথে যুক্ত; এবং লেখক ও মানবাধিকারকর্মী মেগান লাম্পা, যিনি তৃণমূল সংহতির ওপর আলোকপাত করেন। অন্যদিকে কমিউনিটি প্রতিনিধি আবরার আহমেদ অন্যান্য অতিথিদের সাথে স্মরণ, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অধিকার বিষয়ে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে একটি সর্বজনীন মানবাধিকার ও গণতন্ত্রচর্চার প্ল্যাটফর্মে রূপ দেয়।

আয়োজকরা জানান, এই প্রদর্শনী কেবল স্মৃতিচারণের জন্য নয়; বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়কে সংরক্ষণ করা এবং জুলাই ২০২৪-এর মাধ্যমে গড়ে ওঠা প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, ত্যাগ ও আকাঙ্ক্ষাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি আন্তরিক প্রয়াস।

উল্লেখ্য, অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সুপ্রভাত সিডনি মিডিয়া গ্রুপ’ ছিল এই মর্যাদাপূর্ণ ইভেন্টের অফিসিয়াল মিডিয়া পার্টনার। ‘SStv Australia’-র জনপ্রিয় লাইভ স্ট্রিমার এএনএম মাসুম এবং সুপ্রভাত সিডনির প্রধান সম্পাদক আবদুল্লাহ ইউসুফ শামীম উপস্থিত থেকে পুরো ইভেন্টটি পর্যবেক্ষণ করেন। আয়োজকদের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ছিল এক কথায় অসাধারণ।

পরিশেষে, ‘বাংলাদেশী ডায়াস্পোরা ইন সিডনি’ এই মহতী আয়োজনকে সফল করে তোলার জন্য সকল সম্মানিত অতিথি, বক্তা, কমিউনিটি নেতা, স্বেচ্ছাসেবক ও দর্শনার্থীদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *