
জনি সিদ্দিক: আধুনিক সময়ের প্রমোদতরিগুলো একেকটি যেন প্রকৌশলের বিস্ময়। উঁচু উঁচু ও বিশাল আকারের প্রমোদতরিগুলো হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে মহাসমুদ্রের বুকে ভেসে বেড়ায়। এমন বড় বড় জাহাজ একটি দুটি নয়, অনেক আছে। আইকন অব দ্য সিজ বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রমোদতরি বা জাহাজ। টাইটানিক এক কালে পৃথিবীবিখ্যাত সব চেয়ে বড় জাহাজ ছিল। এই জাহাজগুলোতে একটা আধুনিক শহরে বসবাস করার জন্য যে সকল উপাদান প্রয়োজন, সুযোগ সুবিধা দরকার, তার সব সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান ছিল; বরং তার চেয়েও বেশি বৈচিত্র ছিল। এতে সুইমিং পুল থেকে শুরু করে খেলাধুলার স্থানসহ সবকিছুই রয়েছে। টাইটানিকসহ বিশাল বিশাল আকারের জাহাজ সমূহ হলো মহান আল্লাহর বিশেষ নিদর্শন। মূলত টাইটানিক জাহাজের ঘটনায় সবার এই ভুল ভেঙেছে যে, “নাহ! টাইটানিকের মতো বড় জাহাজও ডুবতে পারে।” টাইটানিক জাহাজ অহংকারীদের অহমিকা বোধ ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে।
মানুষের দম্ভ বনাম আল্লাহর ক্ষমতা
তৎকালীন প্রচার মাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের মাঝে এমন এক বিশ্বাস জন্মেছিল যে, টাইটানিক কখনো ডুবতে পারে না। ইতিহাসে পাওয়া যায়, এক নাবিক তো দম্ভ করেই বলেছিলেনÑ “এমনকি ঈশ্বরও এই জাহাজ ডুবাতে পারবেন না!”(নাউযুবিল্লাহ) কিন্তু তারা এটি ভেবেছিল এজন্য যে, তারা আল-কুরআনকে বিশ্বাস করে না, তারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না। টাইটানিক জাহাজ তার প্রথম যাত্রাতেই সলিল সমাধি হয়। ১৯১২ সালের ১৪ এপ্রিল মধ্যরাতে দুর্ভাগ্যক্রমে বরফখণ্ডের সঙ্গে সংঘর্ষ লেগে এটি পানির তলায় তলিয়ে যায়। শত চেষ্টা করেও নাবিকেরা জাহাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তাদের সকল প্রতিষ্ঠাব ব্যর্থ হয়ে যায়। আর তারা পারবেই বা কী করে? ভাগ্যের উপর তো আর মানুষের হাত থাকে না! যখন আল্লাহ বলছেন যে:
“তারই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জাহাজসমূহ, যা সমুদ্রপৃষ্ঠে পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে বিচরণ করে।” (সূরা আর-রহমান: ২৪)।
কুরআনের আয়াতের জীবন্ত প্রতিফলন
টাইটানিক মূলত এর করুণ পরিণতির জন্যই সবার স্মৃতিতে বার বার নাড়া দেয়। আল কোরআনের সূরা ইয়াসিনের ৪১-৪৪ আয়াত ও সূরা রহমানের ২৪ নং আয়াত তেলাওয়াত করার সময় চোখের সামনে ভেসে উঠে সেই টাইটানিক জাহাজডুবির চিত্র। মানুষ আল্লাহকে অস্বীকার করে কীভাবে ভোগ-বিলাসে মদমত্ত হয়ে থাকতে পারে? কূল কিনারাহীন সাগরের মাঝে, সেখানে মানুষ নির্ভীকচিত্তে কীভাবে থাকতে পারে, আর তার পরিণতিই বা কী? তার বড় প্রমাণ টাইটানিক জাহাজ।
উদ্ধত টাইটানিক জাহাজের মানুষ নিশ্চিত বিপদ জানতে পেরেও মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা না চেয়ে মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়ায় আল্লাহ নাখোশ হয়ে বেশি শাস্তি দেন তাদের। তারা ভুলে গিয়েছিল যে আল্লাহ ছাড়া রক্ষাকর্তা কেউ নেই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা ইয়াসিনে স্পষ্টভাবে এই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন:
“আর তাদের জন্য আমার আরেকটি নিদর্শন এই যে, আমি তাদের বংশধরদেরকে নৌ-যানে (বোঝাই করা ছিল) আরোহণ করিয়েছিলাম। আর আমি তাদের জন্য বিভিন্ন আকৃতির জাহাজ বা নৌ-যান সৃষ্টি করেছি, যেন তারা তাতে আরোহণ করতে পারে। আর যদি আমি সেগুলো ডুবিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা করি তবে ডুবিয়ে দিতে পারি, আর তখন তাদের নালিশ বা আকুতি শোনার কেউ থাকবে না আর তারা মুক্তিও পাবে না। আমার পক্ষ হতে রহমত এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদেরকে উপভোগের সুযোগ দেওয়া ব্যতীত।” (সূরা ইয়াসিন: ৪১-৪৪) অত্র আয়াতে কারিমাসমূহের ব্যাখ্যায় জনৈক প্রাবন্ধিক বলেছেনÑ “এই আয়াতগুলোতে সাগর ও মহাসাগরের কিছু ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: যেসব জাহাজ সাগরে চলাচল করে এবং মানুষ ও মালামাল পরিবহন করে তাতেও আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন রয়েছে। কারণ তিনি এমনভাবে জলরাশি সৃষ্টি করেছেন যাতে জাহাজের আরোহীরা পানিতে ডুবে না গিয়ে দূর-দূরান্তের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। অবশ্য বর্তমানে ট্রেন ও বিমানসহ নানা ধরনের আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও আজও সবচেয়ে বেশি পণ্য পরিবহন করা হয় জাহাজের মাধ্যমে। বর্তমানে খাদ্য ও জরুরি পণ্যের পাশাপাশি তেল ও তরল গ্যাসের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ যদি জাহাজে করে একস্থান থেকে অন্যস্থানে নেয়া না যেত তাহলে মানুষের জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন হয়ে যেত। যদি আল্লাহ তায়ালা জাহাজ ভাসিয়ে রাখার ব্যাপারে পানির এ বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য তুলে নেন তাহলে সব জাহাজ তলিয়ে যাবে এবং তখন এসব জাহাজের যাত্রীদেরকে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ বাঁচাতে পারবে না। ভূপৃষ্ঠ ও সাগরে চলাচলকারী নানা ধরনের বাহন মানুষের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত হয়। এসব বাহন চলাচলের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আল্লাহতায়ালা সৃষ্টির শুরুতেই তৈরি করে রেখেছেন। আল্লাহ আমাদেরকে যত নেয়ামত দান করেছেন তার সবগুলোকে মহান প্রভুর দান মনে করতে হবে। এর কোনোটিই আমরা তাঁর কাছ থেকে চেয়ে পাইনি, বরং স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আল্লাহ দান করেছেন।” (সূরা ইয়াসিন: আয়াত ৩৬-৪৪, সৃষ্টিজগতের অন্যতম মৌলিক বিধান, ঘবংি২৪) কাজেই আমাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে যেন অহঙ্কার না করি কারণ তাতে আল্লাহর মহাক্রোধের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে। আর আল্লাহ আমাদের উপর রাগান্বিত হলে বিভিন্ন প্রকার বিপদ আপদ হাজির হবে।
প্রযুক্তির অসহায়ত্ব ও শিক্ষা
টাইটানিক যখন ডুবছিল, তখন সেই সময়ের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, শক্তিশালী ইঞ্জিন আর বিশালকায় বডি কোনো কাজেই আসেনি। এমনকি জাহাজটিতে পর্যাপ্ত লাইফবোট পর্যন্ত রাখা হয়নি এই দম্ভে যে এটি তো কখনো ডুববে না! আল্লাহর ইচ্ছা যখন কার্যকর হয়, তখন মানুষের সমস্ত প্রযুক্তি মাকড়সার জালের মতো দুর্বল হয়ে পড়ে। আল্লাহ বলেন:
“তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদেরকে পেয়ে বসবেই, যদিও তোমরা সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গের মধ্যে অবস্থান কর। যদি তাদের কোন কল্যাণ ঘটে, তখন তারা বলে, এটা আল্লাহর তরফ হতে। পক্ষান্তরে যদি তাদের কোন অকল্যাণ ঘটে তখন বলে, ‘এটা তো তোমার তরফ হতে।’ বল, ‘সবকিছুই আল্লাহর তরফ হতে।’ এ সম্প্রদায়ের হল কী যে, তারা কোন কথাই বুঝে না।” (সূরা নিসা: ৭৮)
টাইটানিকের সেই বিলাসবহুল ক্যাবিন আর সোনা-রুপার পাত্রগুলো আজ সমুদ্রের তলায় মরিচা ধরা কঙ্কাল মাত্র। এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর কুদরতের সামনে অহংকার যুক্ত বিলাসিতা বা আভিজাত্যের কোনো মূল্য নেই। মানবতার মুক্তির দূত রাসূল (সা:) বলেছেনÑ ‘‘আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামীদের সম্পর্কে সংবাদ দেবো না? সাহাবারা বললেন: অবশ্যই দিবেন। তখন তিনি বলেন: জাহান্নামী হচ্ছে প্রত্যেক কঠিন প্রকৃতির ধনী কৃপণ অহঙ্কারী’’। (বুখারী ৪৯১৮, ৬০৭১, ৬৬৫৭; মুসলিম ২৮৫৩)
বর্তমান প্রজন্মের জন্য সতর্কতা
টাইটানিক কেবল একটি জাহাজডুবির ঘটনা নয়, এটি কিয়ামত পর্যন্ত আসা মানুষের জন্য একটি সতর্কবাণী। বর্তমান বিশ্বেও মানুষ আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মোহে পড়ে খোদাদ্রোহী হয়ে উঠছে। মানুষ ভাবছে তারা মহাকাশ জয় করছে, বড় বড় শহর বানাচ্ছে তাই তাদের কোনো বিপদ স্পর্শ করবে না। কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত, লুত (আ.)-এর জাতি বা আ’দ-সামুদ জাতিও তাদের স্থাপত্যশৈলী ও শক্তির দম্ভ করেছিল, কিন্তু আল্লাহর আজাব থেকে তারা রেহাই পায়নি। মাত্রাতিরিক্ত পরিমান খোদাদ্রোহীতা, অবাধ্যতা এবং পাপাচারের কারণে তা আমাদের উপর আল্লাহর ক্রোধ নিয়ে আসে। সূরা গাফিরের ২৭ নম্বর আয়াতে এসেছেÑ “যারা হিসাব দিবসে বিশ্বাসী নয় সে সকল অহঙ্কারী ব্যক্তি থেকে আমি আমার ও তোমাদের প্রভুর আশ্রয় কামনা করছি।” অহংকারের পর পরিণতি সম্পর্কে রসূল (সা:) বলেছেনÑ‘‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ গর্ব থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। জনৈক সাহাবী বললো: ইয়া রাসূল (সা:) মানুষ তো চায় যে, তার কাপড় সুন্দর হোক এবং তার জুতো সুন্দর হোক (তাও কি গর্ব বলে গণ্য হবে?) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা‘আলা সুন্দর। অতএব তিনি সুন্দরকেই পছন্দ করেন। তবে গর্ব হচ্ছে সত্য প্রত্যাখ্যান এবং মানব অবমূল্যায়ন’’। (মুসলিম ৯১)
উপরোক্ত আলোচনা ও আয়াত থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, টাইটানিক জাহাজডুবি মহান আল্লাহর আয়াতেরই যথার্থ প্রতিফলন। এটি আমাদের শেখায় যে, মানুষ তার শ্রম ও মেধা দিয়ে জাহাজ তৈরি করতে পারে, কিন্তু সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে তাকে ভাসিয়ে রাখার ক্ষমতা কেবল আল্লাহর। আমরা সামান্য একটি লোহার টুকরা পানিতে ফেলে দিলে ডুবে যায়, অথচ লোহার তৈরি বিশাল আকারের জাহাজ ডুবে না। আসুন, আমরা দম্ভ পরিহার করে মহান আল্লাহর দরবারে নতি স্বীকার করি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- ‘বড়ত্ব বা অহংকার আমার চাদর, অহংকার আমার ইযার (লুঙ্গি)। কেউ যদি এ দুইটির কোনো একটির ব্যাপারে আমার সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত হয় বা টানা হেঁচড়া করে তবে আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।’ (মুসলিম, মিশকাত)