
মায়ানমারে মুসলমানদের আগমন নবম শতাব্দীতে আরব বণিকদের মাধ্যমে শুরু হলেও দ্রুতই উপকূলীয় বন্দরগুলোতে বসতি গড়ে তুলে মুসলিমরা স্থানীয় সমাজে মিশে যায় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক ও সামরিক কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে। পেগান কিংডম এবং কোনবাউং ডাইনেস্টির আমলে বহু মুসলিম রাজকীয় উপদেষ্টা, সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্বদানকারী, বন্দর প্রধান এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। অর্থাৎ, মুসলিমরা তৎকালীন বার্মায় রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন।
বার্মিজ মুসলিমদের ঐতিহাসিক উপস্থিতির সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায় রাখাইন স্টেট বা প্রাচীন আরাকান অঞ্চলে। মধ্যযুগে এই অঞ্চলটি ছিল সংস্কৃতির এক মিলনভূমি এবং এখানে মুসলিম ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সহাবস্থান ঘটেছিল। আরাকান রাজসভায় মুসলিম কবি ও পণ্ডিতদের ব্যাপক প্রভাব ছিল। আলাওলের মতো কবি সেখানে বসেই তাঁর অমর সাহিত্যকর্ম রচনা করেন। সেই সময় আরাকানের মুদ্রায় আরবি লিপির ব্যবহার মুসলিম রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।
বার্মায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন চলাকালে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। ব্রিটিশ প্রশাসন অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাজের জন্য ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষকে বার্মায় নিয়ে যায়। বাংলা, বিহার ও দক্ষিণ ভারত থেকে আগত মুসলিমরা তখনকার রেঙ্গুন (বর্তমান ইয়াঙ্গুন) শহরে ব্যবসা-বাণিজ্য, জাহাজ চলাচল, ব্যাংকিং এবং প্রশাসনিক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর ফলে শহুরে অর্থনীতিতে মুসলিমদের একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়, যা পরবর্তীকালে স্থানীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মধ্যে উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মায়ানমারের মুসলিম সমাজ বহুবিচিত্র। রোহিঙ্গারা রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে বসবাসকারী সবচেয়ে আলোচিত গোষ্ঠী, যাদের ভাষা ও সংস্কৃতি চট্টগ্রাম অঞ্চলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাদের বাইরে রয়েছে বার্মিজ মুসলিম, যারা স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গেছে; কাম্যান মুসলিম, যারা সরকারিভাবে স্বীকৃত হলেও বৈষম্যের শিকার; পান্থে মুসলিম, যারা চীনা বংশোদ্ভূত এবং দক্ষিণাঞ্চলের পাসু মুসলিম, যাদের সাংস্কৃতিক শিকড় মালয় অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত।
সমস্যার মূল কেন্দ্র তৈরি হয় নাগরিকত্ব ও রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নিয়ে। ১৯৮২ সালের মিয়ানমার নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের বড় অংশকে নাগরিকত্বের বাইরে ঠেলে দেয়, যার ফলে তারা রাষ্ট্রবিহীন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ‘হোয়াইট কার্ড’ সংকট(এক ধরনের অস্থায়ী পরিচয়পত্র) যা একসময় ভোটাধিকার দিলেও ২০১৫ সালের পর তা বাতিল হয়ে যায়। এতে করে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সব পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ধর্মীয় ক্ষেত্রেও নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়—মসজিদ নির্মাণ, সংস্কার বা প্রকাশ্যে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের ওপর অলিখিত সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়, এমনকি কিছু ঐতিহাসিক মসজিদও বন্ধ করে রাখা হয়।
এই রাজনৈতিক ও আইনি সংকট সহিংসতার মাধ্যমে আরও গভীর হয়। ২০১২ সালের দাঙ্গা এবং বিশেষ করে রোহিঙ্গ্যা ক্রাইসিস টু থাউজ্যান্ড সেভেন্টিনের সময় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, গ্রাম পোড়ানো এবং গণপালায়নের ঘটনা ঘটে। লক্ষ লক্ষ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, যেখানে বর্তমানে প্রায় ১২-১৩ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। তাদের জীবন প্রধানত আন্তর্জাতিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল, আর সীমিত কর্মসংস্থানের মধ্যে ছোটখাটো ব্যবসা বা হস্তশিল্পই তাদের জীবিকার পথ।
বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে সামরিক শাসন ও গৃহযুদ্ধের কারণে। মায়ানমার মিলিটারি জান্টা ক্ষমতা দখলের পর দেশজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। আরকান আর্মি রাখাইনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। এই ত্রিমুখী সংঘাতে মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মুসলিম যুবকদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে, আবার বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তাদের নিরাপত্তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
এই দীর্ঘ সংকটের ফলে একটি বিস্তৃত বৈশ্বিক অভিবাসন বা ডায়াসপোরা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, ভারত, থাইল্যান্ডসহ বহু দেশে তারা ছড়িয়ে পড়েছে। সৌদি আরবের মক্কা ও জেদ্দা এলাকায় কয়েক দশক ধরে বার্মিজ মুসলিমদের একটি বড় সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে, যেখানে তাদের নিজস্ব শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামো রয়েছে। মালয়েশিয়ায় তারা নির্মাণ ও কৃষি খাতে গুরুত্বপূর্ণ শ্রমশক্তি হিসেবে কাজ করছে, পাকিস্তানের করাচিতে একটি বড় কমিউনিটি রয়েছে এবং ভারতে দিল্লি, জম্মু ও হায়দ্রাবাদে রোহিঙ্গা শরণার্থী বসতি গড়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, যারা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে পুনর্বাসিত হয়েছে, তারা শিক্ষা ও দক্ষতার মাধ্যমে নতুন জীবন গড়ে তুলেছে। অনেকেই প্রকৌশলী, শিক্ষক বা তথ্যপ্রযুক্তি পেশায় যুক্ত হয়ে নিজেদের অবস্থানই শক্ত করেনি, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মায়ানমারের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়েও কাজ করছেন।
আফ্রিকার অমুসলিম দেশে ইসলাম ও মুসলমান
আফ্রিকার অমুসলিম বা খ্রিস্টান-প্রধান দেশগুলোতে ইসলাম ও মুসলমানদের উপস্থিতি শক্তিশালী বাস্তবতা। সংখ্যার দিক থেকে কম মনে হলেও সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মুসলিমরা গভীর প্রভাব বিস্তার করেছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় মুসলমানদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ২-৩ শতাংশ হলেও তাদের প্রভাব তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। ডাচ ও ব্রিটিশ আমলে দাস ও শ্রমিক হিসেবে আনা মানুষদের বংশধরদের মধ্য থেকেই এই কমিউনিটির সূচনা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা ব্যবসা, আইন, রাজনীতি ও সামাজিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে ইমাম আবদুল্লাহ হারুন ও আহমেদ কাঠরাডার মতো নেতারা নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে লড়াই করেছেন, যা মুসলিমদের রাজনৈতিক অবদানকে স্পষ্ট করে। আজও দেশটির বিচার বিভাগ ও মন্ত্রীসভায় মুসলিমদের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। একই সঙ্গে এই দেশে এক শক্তিশালী “হালাল অর্থনীতি” গড়ে উঠেছে এবং অমুসলিম ব্যবসায়ীরাও হালাল সার্টিফিকেশন গ্রহণ করে বৃহৎ বাজারে অংশ নিচ্ছে।
ইথিওপিয়াকে(আবিসিনিয়া) সাধারণত খ্রিস্টান ঐতিহ্যের দেশ বলা হলেও বাস্তবে প্রায় ৩৪-৩৫ শতাংশ মানুষ মুসলিম। এখানকার হারার শহর ইসলামের প্রাচীন কেন্দ্রগুলোর একটি, যাকে অনেকে “চতুর্থ পবিত্র শহর” বলে থাকেন। এই শহরে প্রায় ৮২টি মসজিদ এবং অসংখ্য সুফি মাজার রয়েছে, যা একটি অমুসলিম-প্রধান রাষ্ট্রের ভেতরেও শক্তিশালী ইসলামি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।
কেনিয়ায় মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ১০-১১ শতাংশ, তবে উপকূলীয় অঞ্চলে তাদের প্রভাব অনেক বেশি। নাইরোবিতে প্রায় অর্ধ মিলিয়ন মুসলমান বাস করে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কাদি আদালত (Kadhis’ Courts), যা সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত এবং মুসলিমদের পারিবারিক আইন (বিয়ে, তালাক এবং উত্তরাধিকার) শরিয়াহ অনুযায়ী নিষ্পত্তি করে।
তাঞ্জানিয়ায় মুসলিম ও খ্রিস্টান জনসংখ্যা প্রায় সমান (৩৫-৪০ শতাংশ করে), যদিও রাষ্ট্র কাঠামোতে খ্রিস্টান প্রভাব বেশি ধরা হয়। জাঞ্জিবার দ্বীপে প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ মুসলিম। এটি পূর্ব আফ্রিকার ইসলামি ঐতিহ্যের একটি শক্তিশালী কেন্দ্র। এখানে একটি অলিখিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি লক্ষ্য করা যায়, যেখানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মুসলিম ও খ্রিস্টান নেতৃত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা হয়।
পূর্ব আফ্রিকার এই অঞ্চলগুলোতে ইসলাম স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে এক নতুন পরিচয় তৈরি করেছে। এটা “সোয়াহিলি সংস্কৃতি” নামে পরিচিত। আরব, পারস্য ও আফ্রিকান ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতি ভাষা, পোশাক, স্থাপত্য ও জীবনধারায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। সোয়াহিলি ভাষায় আরবি শব্দভাণ্ডারের শক্তিশালী উপস্থিতি এই ঐতিহাসিক সংযোগের প্রমাণ।
আফ্রিকার মুসলিম সমাজ বহু জাতি ও উপজাতির সমন্বয়। পূর্ব আফ্রিকায় সোমালি, ওরোমো ও সোয়াহিলি মুসলমানদের দেখা যায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় কেপ মালয় (দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় বংশোদ্ভূত) এবং ভারতীয় মুসলিমরা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার প্রেক্ষাপটে ফুলানি ও হাউসা জাতিগোষ্ঠী ইসলাম বিস্তারে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে, যদিও তারা অনেক সময় অমুসলিম-প্রধান রাষ্ট্রের ভেতরে বসবাস করে।
ভাষাগত দিক থেকেও বৈচিত্র্য স্পষ্ট। ধর্মীয় ক্ষেত্রে আরবি ব্যবহৃত হলেও দৈনন্দিন জীবনে সোয়াহিলি, হিউলা (Dioula), ইংরেজি ও ফরাসি গুরুত্বপূর্ণ। এই বহুভাষিক বাস্তবতা মুসলিমদের অভিযোজন ক্ষমতা ও সাংস্কৃতিক নমনীয়তার প্রতিফলন।
শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি দ্বৈত কাঠামো দেখা যায়। একদিকে প্রায় প্রতিটি মুসলিম অঞ্চলে মাকতাব ও মাদ্রাসা রয়েছে, যেখানে কুরআন ও ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয়; অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা ও কেনিয়ার মতো দেশে মুসলিম তরুণরা আধুনিক শিক্ষা (চিকিৎসা, প্রকৌশল ও বিজ্ঞান ইত্যাদি) ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে মধ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয়ের অভাব কর্মসংস্থানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মুসলিমদের ঐতিহাসিক ভূমিকা বাণিজ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মালাউই বা মোজাম্বিকে ভারতীয় মুসলিম ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। অন্যদিকে ফুলানি মুসলিমরা পশুপালন ও কৃষির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়েতে মুসলিমরা শিল্পপতি, চিকিৎসক ও আইনজীবী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত।
ধর্মীয় চর্চার ক্ষেত্রে আফ্রিকার মুসলমানদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো সুফিবাদ ও মরমী ধারার প্রাধান্য। তিজানিয়া, মুরিদিয়া ইত্যাদি সুফি তরিকা এবং তাবলিগি জামাতের মতো আন্দোলন ধর্মীয় প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ধারা অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক সহনশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। রুয়ান্ডার ১৯৯৪ সালের গণহত্যার পর অনেক মানুষ ইসলামের সাম্য ও শান্তির বার্তায় আকৃষ্ট হয়ে ধর্মান্তরিত হয়েছে—এটি একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক পরিবর্তন।
স্থাপত্য ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলোতেও বৈচিত্র্য দেখা যায়। জানজিবার ও উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবাল পাথরের মসজিদে আরব ও পারস্য প্রভাব স্পষ্ট, আবার মধ্য আফ্রিকায় মাটির তৈরি প্রাচীন মসজিদগুলো স্থানীয় স্থাপত্য ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। দক্ষিণ গোলার্ধের অন্যতম বৃহত্তম মসজিদ দক্ষিণ আফ্রিকার নিযামিয়ে মসজিদ উসমানীয় স্থাপত্যের অনুকরণে নির্মিত একটি বড় আকর্ষণ।
এই ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি কিছু কঠিন বাস্তবতাও রয়েছে। অ্যাঙ্গোলাতে ইসলামকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। এদেশে ধর্মীয় স্বীকৃতি পেতে নির্দিষ্ট সংখ্যক স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। এর ফলে মসজিদ নির্মাণেও অনেক সময় বাধা সৃষ্টি হয়। কিছু অঞ্চলে চরমপন্থা দমনের অজুহাতে সাধারণ মুসলমানদের হয়রানির অভিযোগও রয়েছে, যা পরিচয় সংকটকে আরও জটিল করে তোলে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে সাব-সাহারান আফ্রিকার অনেক দেশে মুসলিম সংখ্যালঘুরা এখনও শিক্ষা ও উন্নত কর্মসংস্থানে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে তারা অনেক সময় নিজেদের উদ্যোগে মাদ্রাসা, দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও ক্লিনিক পরিচালনা করে সামাজিক কাঠামো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
এককথায় বললে, আফ্রিকার অমুসলিম-প্রধান দেশগুলোতে মুসলমানদের অবস্থান সমান নয়। কোথাও অর্থনীতি ও রাজনীতিতে প্রভাবশালী সংখ্যালঘু, কোথাও সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের কেন্দ্র, আবার কোথাও আইনি স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াইরত একটি কমিউনিটি। এই বৈচিত্র্যই আফ্রিকার মুসলিম বাস্তবতাকে আলাদা করে তোলে; একই সঙ্গে অভিযোজন, সংগ্রাম এবং অবদানের বহুমাত্রিক ইতিহাসও তুলে ধরে।
এশিয়ার কিছু অমুসলিম দেশে ইসলাম ও মুসলমান
এশিয়ার অমুসলিম প্রধান দেশগুলোতে মুসলমানদের উপস্থিতি কম হলেও ঐতিহাসিক, অভিবাসনভিত্তিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিটি দেশের বাস্তবতা আলাদা। নেপালে মুসলমানরা প্রায় ৫% এবং মূলত ভারত সীমান্তবর্তী তেরাই অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত; তাদের উৎস ভারতীয়, কাশ্মীরি, তিব্বতি ও স্থানীয় মিশ্র এবং প্রায় ৬০০+ মাদ্রাসা থাকলেও ধীরে ধীরে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে একীভূত হচ্ছে। কম্বোডিয়াতে মুসলমানদের বড় অংশ চাম জাতিগোষ্ঠী, যারা ঐতিহাসিকভাবে চম্পা সভ্যতার উত্তরসূরি; খেমার রুজ আমলে ভয়াবহ নির্যাতনের পর এখন তারা টনলে স্যাপ ও মেকং অঞ্চলে বসবাস করে, নিজস্ব মসজিদ, গ্রাম ও শিক্ষাব্যবস্থা বজায় রেখেছে, যদিও সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় শিক্ষায় কিছুটা পিছিয়ে। ভিয়েতনামে মুসলিম সংখ্যা কম (প্রায় ৮০-৯০ হাজার), প্রধানত চাম জনগোষ্ঠী; তারা নিহ থুয়ান ও আন জিয়াং অঞ্চলে বাস করে, যেখানে সুন্নি ও চাম বানি—দুই ধরনের ধর্মীয় চর্চা আছে, কিন্তু উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ সীমিত। দক্ষিণ কোরিয়াতে প্রায় ২ লক্ষ মুসলিম, যার অধিকাংশই বিদেশি শ্রমিক বা শিক্ষার্থী; সিউল (ইতেওয়ান) ও বুসান প্রধান কেন্দ্র, কোরিয়া মুসলিম ফেডারেশন ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং ১৯৫০-র কোরীয় যুদ্ধের সময় তুর্কি সেনাদের মাধ্যমে ইসলামের আধুনিক বিস্তার শুরু হয়। তাইওয়ানে স্থানীয় মুসলিম প্রায় ৬০ হাজার হলেও বিদেশি (বিশেষত ইন্দোনেশীয়) শ্রমিক মিলিয়ে সংখ্যা ৩ লক্ষের কাছাকাছি; তাইপেই গ্র্যান্ড মসজিদ কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে এবং সরকার ‘মুসলিম-ফ্রেন্ডলি’পর্যটন ও হালাল শিল্পে গুরুত্ব দিচ্ছে। মঙ্গোলিয়াতে মুসলমানরা মূলত কাজাখ জাতিগোষ্ঠী, যারা পশ্চিমাঞ্চলের বায়ান-ওলগি প্রদেশে বসবাস করে এবং নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি ও ধর্মীয় শিক্ষা ধরে রেখেছে। লাওসে মুসলিম সংখ্যা খুবই কম, প্রধানত তামিল ও চাম বংশোদ্ভূত; ভিয়েনতিয়েনে সীমিত মসজিদ ও ছোট পরিসরের ধর্মীয় শিক্ষা রয়েছে। পূর্ব তিমুরে মুসলমান প্রায় ১% বা তার কম, অধিকাংশই ইয়েমেনি বা ইন্দোনেশীয় বংশোদ্ভূত; রাজধানী দিলিতে আন-নূর মসজিদ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। ভুটানে মুসলমান প্রায় ১% এবং দক্ষিণাঞ্চলে সীমাবদ্ধ; বড় মসজিদের বদলে ছোট প্রার্থনাকেন্দ্র ও ঘরোয়া ধর্মচর্চা প্রচলিত। উত্তর কোরিয়াতে স্থানীয় মুসলিম সমাজ কার্যত নেই; কেবল পিয়ংইয়ং-এ বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য একটি প্রতীকী মসজিদ রয়েছে। এই পুরো অঞ্চলে মুসলমানদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—সংখ্যায় কম হলেও বাণিজ্য, অভিবাসন ও ঐতিহাসিক সংযোগের কারণে তারা টিকে আছে; অনেক জায়গায় মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা এখনও গুরুত্বপূর্ণ, তবে ধীরে ধীরে আধুনিক শিক্ষার দিকে অগ্রসর হচ্ছে; কোথাও ধর্মীয় স্বাধীনতা তুলনামূলক ভালো (যেমন তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া), আবার কোথাও সীমাবদ্ধতা বা সামাজিক চ্যালেঞ্জ (যেমন ভুটান, উত্তর কোরিয়া) স্পষ্ট।