মোহাম্মদ আলম ফরিদ: গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দৈনিক আমার দেশ-এ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মন্তব্য প্রতিবেদন ‘বাংলাদেশে জিন্নাহবিদ্বেষের পূর্বাপর’ প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহর ছবি নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের পটভূমিতে তিনি একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন: জিন্নাহর প্রতি বিদ্বেষ কি ইতিহাসের বিচারে প্রাপ্য, নাকি স্বাধীনতার পর গড়ে ওঠা একটি নির্মিত বয়ানের ফল? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই নতুন প্রজন্মের ইতিহাস পাঠ নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার।
এই প্রজন্মের একটি অংশ কেন বঙ্গবন্ধুর পরিবর্তে জিন্নাহকে নতুন করে পড়তে আগ্রহী হচ্ছে—এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, গবেষণার মাধ্যমে খুঁজতে হবে। তাদের পাকিস্তানপন্থী, ইতিহাসবিমুখ কিংবা ধর্মীয় উগ্র বলে চিহ্নিত করে বিষয়টি শেষ করে দিলে মূল প্রশ্নটিই এড়িয়ে যাওয়া হবে। একটি প্রজন্ম হঠাৎ করে কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রকে গ্রহণ বা বর্জন করে না। এর পেছনে থাকে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্রের নির্মিত বয়ান, পারিবারিক স্মৃতি, সামাজিক ক্ষোভ এবং ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে তার নিজস্ব উপলব্ধি।
ইতিহাসে যার যা প্রাপ্য, আজ আমরা তা দিলাম কি দিলাম না, তাতে ইতিহাসের খুব বেশি কিছু আসে যায় না। ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। ক্ষমতাবানরা কিছু সময়ের জন্য ইতিহাসের ভাষা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, পাঠ্যপুস্তক লিখতে পারে, স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে পারে, কাউকে নায়ক এবং কাউকে খলনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কিন্তু মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও প্রশ্নকে চিরকাল নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। শেষ বিচারে মানুষের আদালতও অসম্পূর্ণ; আল্লাহর বিচারই সূক্ষ্ম, পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল।
মাহমুদুর রহমান তাঁর আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নাম পরিবর্তনের ঘটনাকে এই নির্মিত বয়ানের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এনেছেন। হলটি ১৯৬৬ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ হল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৭১ সালের মার্চে শিক্ষার্থীরা এর নাম মাস্টারদা সূর্য সেন হল করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯৭২ সালের জুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট তা অনুমোদন করে। রহমানের কাছে এই নাম পরিবর্তন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং স্বাধীনতার সময় ও পরবর্তী পর্যায়ে রাষ্ট্র কীভাবে প্রতীক, নাম ও স্মৃতির পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে নতুন ঐতিহাসিক বয়ান নির্মাণ করেছে, তার একটি দৃষ্টান্ত।
এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত হওয়া বা না হওয়া আলাদা বিষয়। কারণ নাম পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উদ্দেশ্য কতটা কাজ করেছিল, তা নির্ধারণের জন্য সমকালীন দলিল ও সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটও দেখা দরকার। একইভাবে সূর্য সেনের রাজনৈতিক আদর্শ, ধর্মীয় পরিচয় এবং তাঁর সংগঠনের চরিত্র সম্পর্কেও কোনো একক রাজনৈতিক বর্ণনাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ না করে ঐতিহাসিক গবেষণার আলোকে বিচার করা উচিত। রহমান তাঁর লেখায় সূর্য সেনকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও জিন্নাহকে মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে তুলনা করেছেন। এই তুলনা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলতে পারে, কিন্তু এর প্রতিটি ঐতিহাসিক দাবিই পৃথকভাবে যাচাইযোগ্য।
আর এখানেই বৃহত্তর প্রশ্নটি আসে। একটি রাষ্ট্র তার প্রতীক ও স্মৃতির পুনর্বিন্যাস করবে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পুনর্বিন্যাস যদি কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রকে বোঝার পরিবর্তে তাকে একমাত্রিক নায়ক বা খলনায়কে পরিণত করে, তখন ইতিহাসচর্চা দুর্বল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রভাষা নিয়ে জিন্নাহর অবস্থান অবশ্যই সমালোচনার বিষয়; কিন্তু একটি বক্তৃতার রাজনৈতিক ভুলের বিচার আর একজন ব্যক্তির সমগ্র রাজনৈতিক জীবনকে একটি মাত্র ঘটনার মাধ্যমে বিচার করা এক বিষয় নয়।
বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকা অস্বীকার করার অর্থ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে অস্বীকার করা। কিন্তু তাঁকে ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে মূল্যায়ন করার অর্থ তাঁকে নিষ্পাপ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়। এখানেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুতর সমস্যা তৈরি হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বিচার করার পরিবর্তে তাঁকে ক্রমে এমন এক প্রতীকে পরিণত করা হয়েছিল, যার সমালোচনা অনেক সময় রাষ্ট্র, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
কিন্তু কোনো মানুষই ইতিহাসের ঊর্ধ্বে নন। বঙ্গবন্ধুও নন।
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভূমিকা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু তাঁকে প্রশ্নাতীত করে তোলা ইতিহাসচর্চার কাজ নয়। কোনো রাজনৈতিক নেতাকে বুঝতে হলে তাঁকে তাঁর সময়, রাজনৈতিক পরিবেশ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং চিন্তার বিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেখতে হয়। মানুষ হিসেবে তাঁর সাফল্য যেমন থাকবে, তেমনি ভুল ও সীমাবদ্ধতাও থাকবে।
বঙ্গবন্ধুকে মানুষ হিসেবে পড়তে গেলে তাঁর নিজের লেখাই প্রথম দলিল। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-এর ৩৬ নম্বর পৃষ্ঠায় তরুণ বয়সের রাজনৈতিক মানসিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, “অখণ্ড ভারতে যে মুসলমানদের অস্তিত্ব থাকবে না এটা আমি মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করতাম।” একই আলোচনায় তিনি ভারতবর্ষের মুসলমান এবং পাকিস্তানের হিন্দুদের সমান অধিকারের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ তাঁর সেই সময়ের রাজনৈতিক চিন্তার পেছনে ছিল ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক নিরাপত্তার আশঙ্কা এবং পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি তাঁর সমর্থন; একই সঙ্গে সংখ্যালঘুদের অধিকার সম্পর্কেও তিনি একটি অবস্থান প্রকাশ করেছিলেন।
এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধুকে কেবল ১৯৭১-এর আলোকে দেখলে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার পূর্ববর্তী বিবর্তনের একটি বড় অংশ অদৃশ্য হয়ে যায়। আবার তাঁর পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণকে সামনে এনে ১৯৭১-এর ভূমিকা অস্বীকার করাও ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না। বরং একজন রাজনৈতিক মানুষ কীভাবে সময়ের সঙ্গে নিজের চিন্তা, অবস্থান ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার পরিবর্তন করেছেন—সেই বিবর্তনই ইতিহাসের অনুসন্ধানের বিষয় হওয়া উচিত।
এ কারণেই ১৯৭১-এর ঘটনাবলি নিয়েও প্রশ্ন করা অপরাধ নয়। ৭ মার্চের ভাষণের পর রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা কতটা খোলা ছিল? ২৫ মার্চের পূর্বাপর পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কৌশল কী ছিল? স্বাধীনতার ঘোষণা, তার সময় ও পদ্ধতি নিয়ে পরবর্তী সময়ে যে বিভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে, সেগুলোর পেছনে কোন দলিল রয়েছে? এসব প্রশ্নকে ভয় পাওয়ার কী আছে? একজন নেতার ঐতিহাসিক মর্যাদা সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হলে গবেষণার প্রশ্ন তাঁর মর্যাদা নষ্ট করবে না; বরং তাঁর ভূমিকার জটিলতা আরও স্পষ্ট করবে।
স্বাধীনতার পরের বঙ্গবন্ধুকে তো আরও বেশি নিরপেক্ষভাবে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন।
যে নেতা গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এলেন, তাঁর শাসনামলে কেন রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ল? কেন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সংঘাত তীব্র হলো? রক্ষীবাহিনীকে ঘিরে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগের প্রকৃতি কী ছিল? কেন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত হলো? কেন ১৯৭৫ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো, বাকশাল, প্রতিষ্ঠিত হলো?
এসব প্রশ্ন কোনো দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নয়; এগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রশ্ন। তবে এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে অভিযোগ, সরকারি দলিল, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা, গবেষকদের ব্যাখ্যা এবং রাজনৈতিক প্রচারণাকে আলাদা করে বিচার করতে হবে।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষও একইভাবে গবেষণার বিষয়। খাদ্যসংকট, বন্যা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, বাজারব্যবস্থার দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি—সবকিছু বিশ্লেষণ করতে হবে। কোনো একটি কারণকে সবকিছুর একমাত্র ব্যাখ্যা বানানো যেমন ভুল, তেমনি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ যে রাষ্ট্রকে মানুষ মুক্তির প্রতিশ্রুতি হিসেবে পেয়েছিল, সেই রাষ্ট্রেই যখন মানুষ অনাহারে মারা যায়, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
আর এখানেই রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি যুক্ত হয়।
একজন রাজনৈতিক নেতা ইতিহাসের বইয়ে যত বড়ই হোন, একজন ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে তাঁর রাজনৈতিক মহত্ত্বের চেয়ে একমুঠো খাদ্য বেশি বাস্তব। একটি পরিবারের কাছে রাষ্ট্রের আদর্শের চেয়ে নিখোঁজ বা নিহত স্বজনের স্মৃতি বেশি শক্তিশালী। একজন বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীর কাছে রাষ্ট্রের জাতীয় বয়ানের চেয়ে কারাগারের অভিজ্ঞতা বেশি সত্য। ইতিহাসের গবেষণায় এই মানবিক স্মৃতিগুলো বাদ দিলে আমরা কেবল রাষ্ট্রের ইতিহাস লিখব, মানুষের ইতিহাস লিখব না।
সম্ভবত আওয়ামী লীগের বড় রাজনৈতিক ভুল বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসা নয়; তাঁকে প্রশ্নাতীত করে তোলা। তাঁকে যত বেশি মানবিক ভুলের ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে জমে থাকা প্রশ্নগুলো তত বেশি বিস্ফোরক হয়েছে। একটি প্রজন্ম যখন দেখেছে যে একটি রাজনৈতিক দল বঙ্গবন্ধুর নামকে রাজনৈতিক বৈধতার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, তখন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রতি বিরক্তি ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুর ইতিহাসের প্রতিও বিরক্তিতে পরিণত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
তারপর আসে জিন্নাহ প্রসঙ্গ।
এই প্রজন্মের কেউ যদি জিন্নাহকে নতুন করে পড়তে শুরু করে, আমাদের প্রথম কাজ তাকে গালি দেওয়া নয়। বরং প্রশ্ন করা—সে জিন্নাহর মধ্যে কী খুঁজে পাচ্ছে? সে কি পাকিস্তানকে ভালোবাসার কারণে জিন্নাহকে পড়ছে, নাকি প্রচলিত ইতিহাসের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে জিন্নাহর কাছে যাচ্ছে? সে কি দ্বিজাতিতত্ত্বকে গ্রহণ করছে, নাকি কেবল বঙ্গবন্ধুর একচ্ছত্র রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বিরুদ্ধে একটি প্রতীক খুঁজছে?
এ দুটির মধ্যে বিশাল পার্থক্য আছে।
জিন্নাহকে পড়া মানেই তাঁর সব রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করা নয়। আবুল মনসুর আহমেদের ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’-এ পাকিস্তান আন্দোলনের পেছনে ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নের একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। একইভাবে যশবন্ত সিং তাঁর ‘Jinnah: India–Partition–Independence’ গ্রন্থে জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক পর্যায়কে একমাত্রিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কাঠামোয় না দেখে তাঁর রাজনৈতিক বিবর্তনের আলোকে বিচার করার চেষ্টা করেছেন।
অর্থাৎ একটি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়, চিন্তার পরিবর্তন, সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা—সবকিছুকে একসঙ্গে পড়তে হয়।
জিন্নাহর ইতিহাসেরও বিচার হতে হবে একই ইনসাফের সঙ্গে। পাকিস্তান সৃষ্টিতে তাঁর নেতৃত্ব, মুসলমানদের রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্ন, দ্বিজাতিতত্ত্ব, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামো এবং পূর্ব বাংলার সঙ্গে পরবর্তী রাজনৈতিক সম্পর্ক—সবই গবেষণার বিষয়। জিন্নাহকে যেমন অন্ধভাবে মহিমান্বিত করা যায় না, তেমনি তাঁকে কেবল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বশত্রু হিসেবে দেখিয়েও ইতিহাস শেষ করা যায় না।
এই ইনসাফের অর্থ জিন্নাহর সমালোচনা বাদ দেওয়া নয়। বরং তাঁর ভুলের যথাযথ বিচার করাও ইনসাফের অংশ। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা নিয়ে জিন্নাহর অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়। তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। ঢাকার রেসকোর্স ময়দান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বক্তব্যে সেই অবস্থান স্পষ্ট হয়েছিল। এই অবস্থান পূর্ব বাংলায় ব্যাপক বিরোধিতার জন্ম দেয় এবং পরবর্তী ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
কিন্তু একই সঙ্গে একটি মৌলিক কালানুক্রম মনে রাখা জরুরি: জিন্নাহ ১৯৪৮ সালেই ইন্তেকাল করেন। অতএব ১৯৫২ সালের গুলিবর্ষণ কিংবা ১৯৭১ সালের গণহত্যার প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক দায় তাঁর ওপর আরোপ করা ইতিহাসের কালানুক্রমের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তির সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আলোচনা করা এক বিষয়, আর পরবর্তী সময়ের নির্দিষ্ট ঘটনার প্রত্যক্ষ দায় তাঁর ওপর চাপানো আরেক বিষয়। ইনসাফের জন্য এই পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
এখানে জিন্নাহ ও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও একটি তুলনামূলক প্রশ্ন তোলা যায়। দুজনের ক্ষেত্রেই কি কোনো পর্যায়ে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক দাবি আদায়ের কৌশল হিসেবে পৃথক রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল? জিন্নাহর ক্ষেত্রে পাকিস্তানের দাবি কীভাবে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সমঝোতার হাতিয়ার থেকে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে পরিণত হলো? বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসনের দাবি ও স্বাধীনতার সম্ভাবনার সম্পর্ক কোন পর্যায়ে কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বিশ্বাসের ওপর নয়, তাঁদের সমকালীন বক্তব্য ও দলিলের ওপর নির্ভর করা উচিত।
এই তুলনা তাঁদের এক করে দেয় না। বরং দেখায়, ইতিহাসের রাজনৈতিক চরিত্রগুলোকে স্থির ছকে বোঝা কতটা কঠিন।
এই প্রসঙ্গে শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক চিন্তাও আলোচনার দাবি রাখে। পিনাকী ভট্টাচার্য সম্প্রতি এমন একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক চিন্তা—বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার প্রশ্ন। এই বক্তব্যকে সরাসরি ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে জিয়াউর রহমানের নিজের লেখনী, বক্তব্য এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দলিলের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কারণ শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক চিন্তায় ইসলামি পরিচয় ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রপরিচয়ও একটি কেন্দ্রীয় ধারণায় পরিণত হয়। তাঁর সময়ে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ এমন একটি রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে সামনে আসে, যা ভাষা বা ধর্মের একক ভিত্তির পরিবর্তে ভূখণ্ড, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতাকে জাতীয় পরিচয়ের আলোচনায় যুক্ত করেছিল।
অন্যদিকে, জিয়াউর রহমানের ১৯৭২ সালের ‘দ্য বার্থ অব আওয়ার নেশন’ প্রবন্ধে জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের ঢাকার ভাষণ এবং উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থানের সরাসরি সমালোচনা রয়েছে। সেখানে তিনি মনে করেন, জিন্নাহর এই অবস্থান বাঙালির জাতীয় চেতনাকে আরও দৃঢ় করে তুলেছিল। ফলে মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য ও জিন্নাহর রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে জিয়ার কিছু সম্ভাব্য সাদৃশ্য থাকলেও ভাষা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে তাঁর নিজস্ব অবস্থানকে জিন্নাহর সঙ্গে সরলরৈখিকভাবে এক করে দেখা যায় না।
ফলে শহীদ জিয়াউর রহমানকে জিন্নাহর সরাসরি রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে দেখার পরিবর্তে প্রশ্নটি আরও সূক্ষ্মভাবে দেখা দরকার: মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য, সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্রপরিচয়ের প্রশ্নে জিন্নাহ ও জিয়ার চিন্তার মধ্যে কোথায় সাদৃশ্য ছিল, আর ১৯৭১-এর পর স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতায় কোথায় তাঁদের রাজনৈতিক দর্শন ভিন্ন পথে বিকশিত হয়েছিল? পিনাকী ভট্টাচার্যের বক্তব্য একটি গবেষণাযোগ্য ব্যাখ্যা হতে পারে; কিন্তু তার ঐতিহাসিক সত্যতা নির্ধারণ করতে হলে উভয় নেতার নিজস্ব বক্তব্য ও রাজনৈতিক দলিল পাশাপাশি পাঠ করা জরুরি।
এখানে বঙ্গবন্ধু, জিন্নাহ ও শহীদ জিয়াকে একই মাপকাঠিতে পড়ার অর্থ তাঁদের এক করে ফেলা নয়। এর অর্থ হলো—তিনজনকেই তাঁদের নিজ নিজ সময়, রাজনৈতিক সংকট, সিদ্ধান্ত, সীমাবদ্ধতা ও ঐতিহাসিক পরিণতির আলোকে বিচার করা। কোনো ব্যক্তিকে তাঁর উত্তরসূরিদের রাজনৈতিক ব্যবহারের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিচার না করে তাঁর নিজের সময়ের দলিলেও ফিরে যেতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ইনসাফ।
বঙ্গবন্ধুর অবদান থাকলে তা স্বীকার করতে হবে; তাঁর ভুল থাকলে তাও বলতে হবে। রক্ষীবাহিনী নিয়ে অভিযোগ থাকলে দলিল দিয়ে অনুসন্ধান করতে হবে। বাকশালের রাজনৈতিক চরিত্র বিশ্লেষণ করতে হবে। ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের কারণ ও দায় নির্ধারণ করতে হবে। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিভিন্ন দাবির দলিল সামনে আনতে হবে। একইভাবে জিন্নাহর রাজনৈতিক সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা, দ্বিজাতিতত্ত্বের শক্তি ও দুর্বলতা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ব্যর্থতা এবং ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক পরিণতিকেও একই নির্মোহতায় বিচার করতে হবে। শহীদ জিয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা, জাতীয়তাবাদ, ইসলামি পরিচয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও শাসনামলের বিতর্ককে একইভাবে দলিলের আলোকে পর্যালোচনা করতে হবে।
কারণ ইতিহাসের প্রতি ইনসাফ মানে কাউকে ধ্বংস করা নয়, কাউকে রক্ষা করাও নয়।
ইনসাফ মানে সত্যকে তার নিজের জায়গায় দাঁড় করানো।
আজ আমরা চাইলে বঙ্গবন্ধুকে আরও বড় করতে পারি, জিন্নাহকে আরও ছোট করতে পারি। অথবা উল্টোটা করতে পারি। আবার শহীদ জিয়াকে কারও কাছে জাতীয় মুক্তির প্রতীক, কারও কাছে বিতর্কিত রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি। কিন্তু তাতে ইতিহাস বদলাবে না। আমাদের কাজ হওয়া উচিত এমন একটি ইতিহাসচর্চা তৈরি করা, যেখানে বঙ্গবন্ধু মানুষ হিসেবে থাকবেন—তাঁর মহত্ত্ব, ভুল, সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে; জিন্নাহও মানুষ হিসেবে থাকবেন—তাঁর রাজনৈতিক প্রতিভা, সীমাবদ্ধতা ও ঐতিহাসিক পরিণতি নিয়ে; আর শহীদ জিয়াকেও পড়তে হবে তাঁর নিজের সময়, চিন্তা ও রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে।
মাহমুদুর রহমানের একটি পর্যবেক্ষণ এখানে প্রাসঙ্গিক। সাম্প্রতিক বিতর্কের একটি সম্ভাব্য ফল হলো, তরুণ প্রজন্ম জিন্নাহ সম্পর্কে নতুন করে জানতে উৎসাহী হবে। সেই উৎসাহকে দমন না করে দলিলভিত্তিক ইতিহাস পাঠের দিকে নিয়ে যাওয়াই দায়িত্বশীল পথ।
হয়তো তখন আমরা বুঝতে পারব, এই প্রজন্ম আসলে কাকে বেছে নিচ্ছে সেটিই একমাত্র প্রশ্ন নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, কেন তারা আমাদের দেওয়া ইতিহাসের সংস্করণটি আর নিঃশর্তভাবে বিশ্বাস করছে না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে না পারলে আমরা প্রজন্মটিকে হারানোর জন্য তাদের দায়ী করব; কিন্তু কখনো নিজেদের দায়ের দিকে তাকাব না।
আর ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম শিক্ষা সম্ভবত এটাই—যে সমাজ নিজের ভুলের বিচার নিজে করতে ভয় পায়, একদিন তার পরবর্তী প্রজন্ম সেই বিচার অন্যের হাতে তুলে দেয়।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী