মোহাম্মদ আলম ফরিদ: আমি একজন সাধারণ নাগরিক, আলেম নই। ফিকহ, উসুলুল ফিকহ বা আকীদার সূক্ষ্ম বিষয়ে ফতোয়া দেওয়ার যোগ্যতা আমার নেই। কিন্তু একজন মুসলমান ও নাগরিক হিসেবে রাজনীতি, ধর্ম ও সমাজের টানাপোড়েন আমাকেও ভাবায়। সাধারণ মানুষের প্রশ্নও তাই গুরুত্বের দাবি রাখে। আমি এখানে কারও বিরুদ্ধে রায় দিচ্ছি না; শিখতে চাওয়া একজন মানুষের মতো কিছু প্রশ্ন ও ভাবনা সামনে রাখছি।
প্রথম প্রশ্ন হলো, ইসলামে রাজনৈতিক দল কি বৈধ? “ইসলামী রাজনৈতিক দল” নামে সংগঠন করা কি ইসলামের সরাসরি নির্দেশ, নাকি আধুনিক রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি সাংগঠনিক পদ্ধতি? কোনো দল নিজেকে ইসলামী বললে তার সঙ্গে দ্বিমত করা কি ইসলামের বিরোধিতা? আবার কোনো দলের কিছু আকীদাগত, ফিকহি, ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করলেই কি তার সব কর্মী-সমর্থককে গোমরাহ বা ইসলামবিরোধী বলা যায়? বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে যে বিতর্ক চলছে, তার মধ্যে আমার কাছে এই প্রশ্নগুলোই সবচেয়ে জরুরি মনে হয়।
আমার সীমিত বোধ থেকে প্রথমে একটি পার্থক্য করতে চাই। ইসলাম এক জিনিস, আর ইসলামের নামে গড়ে ওঠা মানুষের সংগঠন আরেক জিনিস। কুরআন-সুন্নাহ আমাদের ন্যায়বিচার, আমানতদারি, শূরা, জবাবদিহিতা, সৎকাজের আদেশ, অন্যায়ের প্রতিরোধ, মানুষের অধিকার সংরক্ষণ ও জনকল্যাণের শিক্ষা দিয়েছে। কিন্তু আজ আমরা যে আধুনিক দলীয় কাঠামো দেখি—সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, নির্বাচনী প্রতীক, ইশতেহার ও জোট—এসবের প্রতিটি বিষয় নির্দিষ্ট সাংগঠনিক বিধান হিসেবে কুরআন-সুন্নাহতে এসেছে বলে আমি বুঝি না। তাই রাজনৈতিক দলকে আকীদা বা ইবাদতের স্তরে তোলা ঠিক মনে হয় না। আবার দলীয় রাজনীতিকে ইসলামের সম্পূর্ণ বাইরের বিষয় বলেও উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। আমার সীমিত বোঝাপড়ায়, এ ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থার বৈধতা তার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি, ফলাফল, জনকল্যাণ এবং শরিয়তের সীমারেখা রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ বিষয়ে আলেমদের সুচিন্তিত দিকনির্দেশনা পেলে আমরা সাধারণ মানুষ উপকৃত হব।
এ কারণেই কোনো রাজনৈতিক সংগঠন করা নিজেই ফরজ বা হারাম—এমন সরল সিদ্ধান্ত আমার কাছে যথেষ্ট মনে হয় না। রাজনৈতিক সংগঠন একটি মাধ্যম; এর হুকুম ও মূল্যায়ন তার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি ও পরিণামের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। আবার “ইসলামী” নাম থাকলেই কোনো দলের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ইসলামী হয়ে যায় না। সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা দলকে তার কাজ দিয়েও বিচার করতে পারি। সে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করছে কি না, আমানত রক্ষা করছে কি না, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে কি না, মানুষের জান-মাল-ইজ্জত রক্ষা করছে কি না, দুর্বল ও দরিদ্রের অধিকার দেখছে কি না, সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় কি না এবং ক্ষমতায় গেলে জবাবদিহিতা মানে কি না—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
এই জায়গা থেকেই আমি জামায়াতে ইসলামীর দিকে তাকাই। কেউ জামায়াতকে ইসলামী আন্দোলন হিসেবে দেখেন, কেউ রাজনৈতিক দল হিসেবে, কেউ মওদূদীর চিন্তার ধারক হিসেবে। আবার কেউ এর রাজনৈতিক ইতিহাস ও কিছু আদর্শগত অবস্থানের কারণে কঠোর সমালোচনা করেন। আমার কাছে এসব বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। কারণ দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা, তার কোনো আদর্শগত বক্তব্যের সমালোচনা এবং প্রতিটি কর্মীর ঈমান-আকীদা নিয়ে রায় দেওয়া এক জিনিস নয়।
মাওলানা মওদূদী (রহ.) সম্পর্কেও আমি একই নীতিতে চলতে চাই। তাঁর ইসলামী চিন্তা ও রাজনৈতিক দর্শন উপমহাদেশে গভীর প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে তাঁর কিছু ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা, সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে কিছু ভাষা, খিলাফত ও মুলুকিয়ত নিয়ে কিছু বিশ্লেষণ এবং ইসলামের রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পদ্ধতি নিয়ে বহু সুন্নি আলেম আপত্তি তুলেছেন। সেই আপত্তিগুলো উপেক্ষা করার মতো নয়। আবার তাঁর প্রতিটি লেখা ও অবদান বাতিল করে দেওয়াও আমার কাছে ন্যায়সংগত মনে হয় না। তিনি একজন প্রভাবশালী মুসলিম চিন্তাবিদ ছিলেন, কিন্তু কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নন। তাঁর কোনো বক্তব্য গ্রহণ করার আগে কুরআন-সুন্নাহ, স্বীকৃত তাফসির, হাদিস, আকীদা ও ফিকহের নির্ভরযোগ্য আলেমদের আলোকে তা যাচাই করা দরকার। ইসলামের সত্যতা কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না।
এ প্রসঙ্গে মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের মতো স্বীকৃত ফকিহদের বক্তব্যও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো আলেমের বক্তব্য পর্যালোচনার ঊর্ধ্বে—এমন কথা আমি বলছি না। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ইজতিহাদি মতের সমালোচনা বা প্রত্যাখ্যানের জন্য যে পরিমাণ ইলম, উসুলুল ফিকহ, কুরআন-হাদিস, আরবি ভাষা ও ফিকহি জ্ঞান প্রয়োজন, তা আমার নেই। যে বিষয়ে আমি ইজতিহাদের যোগ্য নই, সেখানে একজন স্বীকৃত ফকিহের সিদ্ধান্তকে নিজের সীমিত জ্ঞানে প্রত্যাখ্যান করার দুঃসাহস আমার না থাকাই উচিত। এটি অন্ধ আনুগত্য নয়; বরং নিজের জ্ঞানের সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকা।
জামায়াত নিয়ে আমার একটি উদ্বেগ আছে, তবে তা আমার সীমিত পড়াশোনা ও পর্যবেক্ষণ থেকে। বহু আলেম বিগত দশকগুলোতে মওদূদী সাহেবের কিছু বক্তব্য নিয়ে সতর্ক করেছেন এবং সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছেন। আমি যে পরিমাণ পড়াশোনা করেছি, তাতে এসব বক্তব্য নিয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে কোনো সামগ্রিক ও স্পষ্ট নীতিগত সংশোধন আমার নজরে পড়েনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা ও আত্মপক্ষসমর্থনের প্রবণতাই দেখেছি। হয়তো আমার জানার ঘাটতি আছে। এমন কোনো স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান থাকলে কেউ জানালে আমি কৃতজ্ঞ হব এবং নিজের ধারণা সংশোধন করব।
আমার উদ্বেগ আসলে একটি নীতির প্রশ্ন। ভুলকে ভুল বলে স্বীকার করা আর প্রিয় নেতাকে ভুলমুক্ত প্রমাণের চেষ্টা করা এক বিষয় নয়। একজন মুসলমান কোনো আলেমের ভালো অবদান স্বীকার করতে পারেন, আবার তাঁর ভুলকে ভুলও বলতে পারেন। সত্যকে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে রাখা এবং ভালো-মন্দকে ইনসাফের সঙ্গে বিচার করা—এটাই ইলমের আদব বলে আমি মনে করি।
তবে এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা আছে। জামায়াতের কোনো আদর্শগত অবস্থানকে সমস্যাজনক মনে করা এক কথা, আর তার প্রত্যেক কর্মী-সমর্থককে গোমরাহ বলা আরেক কথা। কেউ জামায়াতে থাকতে পারেন সংগঠনের বর্তমান রাজনৈতিক কর্মসূচি, সামাজিক কাজ বা রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে। এর অর্থ এই নয় যে তিনি মওদূদী সাহেবের প্রতিটি বক্তব্যকে আকীদার অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাই ব্যক্তি, চিন্তাবিদ, সংগঠন ও সংগঠনের প্রতিটি সদস্যকে একই মাপকাঠিতে বিচার করা ন্যায়সংগত নয়।
জামায়াতের একটি দিকও আমার কাছে স্বীকারযোগ্য মনে হয়। বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে তাদের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, কর্মী গঠন ও নেতৃত্বের কাঠামোর কিছু দিক অন্য রাজনৈতিক দলের জন্যও পর্যবেক্ষণযোগ্য হতে পারে। এটি তাদের সব আদর্শগত অবস্থানকে সমর্থন করার অর্থ নয়। কোনো সংগঠনের ভালো দিক স্বীকার করতে তার সবকিছুকে ভালো বলতে হয় না। যার কোনো আদর্শগত অবস্থানের সমালোচনা করছি, তার ভালো কাজকেও ভালো বলা ন্যায়বিচারের অংশ। সত্য কোনো দলের সম্পত্তি নয়, আবার ভুলও কোনো একটি দলের একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য নয়।
এখানে ইসলামে রাজনৈতিক দলের প্রশ্নটি আমার কাছে আরও পরিষ্কার হয়। ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট আধুনিক রাজনৈতিক দলের নাম দেয়নি; কিন্তু ন্যায়বিচার, শূরা, আমানত, জবাবদিহিতা, জনকল্যাণ ও অন্যায় প্রতিরোধের নীতি দিয়েছে। তাই আধুনিক রাজনৈতিক দল একটি মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু মাধ্যমকে উদ্দেশ্য বানানো যাবে না।
একজন মানুষ নামাজ পড়বেন, নিজের ঈমান ও চরিত্র সংশোধন করবেন, পরিবারকে দ্বীনের পথে আনবেন এবং মানুষকে দাওয়াত দেবেন। একই মানুষ ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, দরিদ্রের অধিকার, যাকাত-ওয়াকফ, সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা ও জনকল্যাণমূলক নীতি নিয়েও ভাবতে পারেন। ইসলামকে কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতে সীমাবদ্ধ করা যেমন অসম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে, তেমনি রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনকেই ইসলামের প্রধান লক্ষ্য বানানোও ঝুঁকিপূর্ণ।
খিলাফতের প্রশ্নেও আমার একই সতর্কতা। ইসলামী রাজনৈতিক ঐতিহ্যে নেতৃত্ব, শূরা, ন্যায়বিচার, জনকল্যাণ ও জবাবদিহিতার গুরুত্বপূর্ণ ধারণা আছে। কিন্তু মুসলিম ইতিহাসে রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপ সব যুগে এক ছিল না। আধুনিক নির্বাচন, সংসদীয় ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ইসলামী রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সম্পর্ক নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা আছে। তাই আধুনিক নির্বাচনে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই “খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল”—এমন দাবি আমার কাছে অতিসরলীকরণ মনে হয়। আবার ইসলামের রাজনৈতিক নৈতিকতাকে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক বলাও ঠিক মনে হয় না।
তাই একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার আসল প্রশ্নগুলো অন্য জায়গায়। যে দলই ক্ষমতায় যাক, তারা কি আমানতদার হবে? বিচার কি স্বাধীন হবে? দুর্নীতি কি কমবে? ঘুষ ও চাঁদাবাজি কি বন্ধ হবে? শ্রমিকের অধিকার কি রক্ষা পাবে? নারীর নিরাপত্তা কি নিশ্চিত হবে? শিশুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য কি অগ্রাধিকার পাবে? দরিদ্র মানুষ কি সামাজিক নিরাপত্তা পাবে? সংখ্যালঘু নাগরিক কি নিরাপদ বোধ করবে? ভিন্নমতের মানুষ কি রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন থেকে মুক্ত থাকবে? ক্ষমতাসীন দলের নেতার বিরুদ্ধেও কি আইন সমানভাবে প্রযোজ্য হবে?
এসব প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর কোনো দলের ইসলামি মূল্যবোধের দাবিকে তার বাস্তব আচরণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হতে পারে। আর উত্তর যদি নেতিবাচক হয়, শুধু নামের সঙ্গে “ইসলামী” শব্দ থাকলেই কোনো রাজনৈতিক প্রকল্প ইসলামি হয়ে যায় না। আবার কোনো দল ইসলামি মূল্যবোধের কথা বললেই তার সব নীতির সমালোচনা বন্ধ করে দিতে হবে—এটিও ইসলামী পদ্ধতি নয়। কুরআন আমাদের সংবাদ যাচাই করতে, ন্যায়বিচার করতে এবং নিজের বা আপনজনের বিরুদ্ধেও ন্যায়ের ওপর অটল থাকতে শিক্ষা দেয়। তাই জামায়াতের সমালোচনা যেমন বৈধ হতে পারে, তেমনি তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত কোনো অভিযোগ যাচাই ছাড়া মেনে নেওয়াও ঠিক নয়।
মতপার্থক্য আর বিভাজনও এক জিনিস নয়। চার মাজহাবের মধ্যে গভীর ফিকহি মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সেই মতপার্থক্যকে সাধারণভাবে মুসলিম উম্মাহর পারস্পরিক বর্জনের ভিত্তি বানানো হয়নি। রাজনৈতিক কৌশল, সাংগঠনিক পদ্ধতি, নির্বাচনী জোট বা রাষ্ট্র পরিচালনার মডেল নিয়ে মতভেদকে প্রতিবার আকীদার লড়াই বানালে মুসলমানদের সহযোগিতার জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়।
আমার কাছে ইসলামী ঐক্যের অর্থও তাই সবাইকে এক দলে আনা নয়। সবাই একই আলেমের অনুসারী হবে, একই মাজহাব মানবে বা একই দলকে ভোট দেবে—ঐক্য এমন নয়। ঐক্য হলো কুরআন-সুন্নাহর মৌলিক বিষয়ে এক থাকা, মতপার্থক্যের জায়গায় ইনসাফ করা, অপরাধকে অপরাধ বলা, ভালো কাজকে ভালো বলা এবং উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থের প্রশ্নে ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠার চেষ্টা করা।
এখানে “এনট্রপি”র উপমাটি আমার কাছে প্রাসঙ্গিক মনে হয়। পদার্থবিজ্ঞানে এনট্রপি সরাসরি সমাজের অনৈক্য বা রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার পরিমাপ নয়; সমাজের ক্ষেত্রে এটি একটি রূপক মাত্র। একটি সুশৃঙ্খল অবস্থা ধরে রাখতে যেমন কাজ ও শক্তি লাগে, তেমনি সামাজিক ঐক্যও নিজে নিজে চিরস্থায়ী হয় না। পারস্পরিক সন্দেহ, ব্যক্তিস্বার্থ, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা এবং ছোট ছোট বিভাজন ধীরে ধীরে বৃহত্তর ঐক্যকে দুর্বল করে দিতে পারে।
জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা, মতাদর্শ ও রাজনৈতিক প্রবণতার মানুষ একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় কাছাকাছি এসেছিল। সেটি কোনো স্থায়ী দলীয় ঐক্য ছিল না; বরং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন শক্তির সাময়িক সমাবেশ ছিল। এখন সেই অভিজ্ঞতা থেকে যদি কোনো শিক্ষা নেওয়ার থাকে, তা হলো—ঐক্য ধরে রাখতে ন্যায়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সত্যনিষ্ঠা, আত্মসমালোচনা এবং ছোট স্বার্থের ওপর বৃহত্তর স্বার্থকে স্থান দেওয়ার চেষ্টা প্রয়োজন।
ইসলামী দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও বিরোধ থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন একে অপরকে মুসলমান হিসেবে অস্বীকার করার কারণ না হয়। তাই জামায়াতকে ভালোবাসতেই হবে—এমন কথা নেই; ঘৃণা করতেই হবে—এমন কথাও নেই। জামায়াতের সমালোচনা করা যাবে, তাদের কোনো নীতি সমর্থনও করা যাবে। কেউ জামায়াতে যোগ দিতে পারেন, কেউ না-ও দিতে পারেন। কেউ মওদূদীর কিছু চিন্তা গ্রহণ করতে পারেন, কেউ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। কিন্তু কোনো পক্ষকেই ইসলামের সমার্থক বানানো যাবে না।
একজন মুসলমানের চূড়ান্ত আনুগত্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ-এর প্রতি। রাজনৈতিক দল, সংগঠন, নেতা, আলেম, পীর ও আন্দোলন—সবই তার নিচে। কোনো সংগঠনের প্রতি আনুগত্য যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে সংগঠনের সিদ্ধান্তই সত্য-মিথ্যার চূড়ান্ত মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, সেখানেই বিপদের শুরু।
এবার মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) ও মাওলানা আবুল আ‘লা মওদূদী (রহ.)-এর মধ্যকার বিরোধের কথায় আসি। এটি একটি ঐতিহাসিক ও আলেমি বিতর্ক, যার সঙ্গে আকীদা, ফিকহ, রাজনৈতিক দর্শন, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তা ও সাহাবায়ে কেরামের ইতিহাস ব্যাখ্যার মতো বহু জটিল বিষয় জড়িত। আমি এ বিতর্কের মীমাংসাকারী নই, সে যোগ্যতাও আমার নেই। তাই এই ঐতিহাসিক বিরোধকে সামনে রেখে বাংলাদেশের কোনো মুসলমানকে সহজে গোমরাহ বা ইসলামবিরোধী বলার প্রবণতার সঙ্গে আমি একমত হতে পারি না।
আমি অত্যন্ত আদবের সঙ্গে দেওবন্দি ধারার সম্মানিত উলামায়ে কেরামের কাছে একটি বিনীত জিজ্ঞাসা রাখতে চাই। উপমহাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মাদানী-মওদূদী বিতর্কের যে অবস্থান তৈরি হয়েছিল, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সেটিকে উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থ, ঐক্য ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কীভাবে উপস্থাপন করা যায়? আমরা সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে আপনাদের দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় থাকি। আমার আশঙ্কা, কোনো ঐতিহাসিক মতভেদকে ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক মুসলমানের একটি অংশকে স্থায়ীভাবে সন্দেহ, বর্জন বা কোণঠাসা করার সংস্কৃতি তৈরি হলে তা উম্মাহর ঐক্যের জন্য কল্যাণকর নাও হতে পারে।
একইভাবে জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্বশীলদের কাছেও আমার একটি বিনীত আবেদন। মাওলানা মওদূদী (রহ.) একজন প্রভাবশালী ইসলামী চিন্তাবিদ ছিলেন—এটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা। কিন্তু কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নন। তাঁর যেসব বক্তব্যের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেমরা আপত্তি তুলেছেন, সেগুলো নিয়ে সব ক্ষেত্রে শুধু ব্যাখ্যা ও আত্মপক্ষসমর্থনের বদলে প্রয়োজনীয় জায়গায় যদি স্পষ্ট করে বলা হয়, “এটি তাঁর ব্যক্তিগত ইজতিহাদ ছিল; আমরা তা গ্রহণ করি না,” তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে আপনাদের অবস্থান আরও পরিষ্কার হবে। এতে মওদূদী (রহ.)-এর অবদান অস্বীকার করতে হবে না, আবার তাঁর ভুলকে ইসলামের অংশ হিসেবে রক্ষাও করতে হবে না। ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও সত্যের প্রতি আনুগত্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই ইলমের আদব।
আমার আপত্তি জামায়াতের সমালোচনার বিরুদ্ধে নয়। আমি শুধু চাই, সমালোচনা হোক নির্দিষ্ট, প্রমাণভিত্তিক ও ন্যায়সংগত। কোনো দলকে তার প্রতিষ্ঠাতার প্রতিটি বক্তব্যের দায়ে চিরকাল বিচার করা যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনি প্রতিষ্ঠাতার প্রতি সম্পর্কের কারণে তাঁর বিতর্কিত বক্তব্যকে চিরকাল সঠিক প্রমাণের চেষ্টা আত্মসমালোচনার পথও বন্ধ করে দেয়। রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মতভেদ আর প্রত্যেক কর্মী-সমর্থকের ঈমান-আকীদা নিয়ে রায় দেওয়াও এক জিনিস নয়। এই পার্থক্য না রাখলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য সহজেই ধর্মীয় বর্জন ও পারস্পরিক শত্রুতায় রূপ নিতে পারে।
শেষে আমার প্রশ্ন, আমরা কেমন রাজনীতি চাই? এমন রাজনীতি, যেখানে ইসলাম শুধু নির্বাচনী স্লোগান? নাকি এমন রাজনীতি, যেখানে ইসলামী নৈতিকতা বাস্তবে ন্যায়বিচার, আমানতদারি, দুর্নীতিবিরোধিতা, জনকল্যাণ, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রমিকের অধিকার, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এবং সংখ্যালঘুর নাগরিক অধিকারে প্রতিফলিত হবে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আমরা কি আমাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাব, যেখানে গতকালের সহযোদ্ধা আজকের শত্রু হয়ে যায়?
জুলাইয়ের যে অভিজ্ঞতা মানুষকে বৃহত্তর পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তা যদি দলীয় হিসাব, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা ও অবিশ্বাসে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে, তাহলে সেটি শুধু রাজনৈতিক ব্যর্থতা হবে না; একটি ঐতিহাসিক সুযোগের অপচয়ও হতে পারে। এনট্রপির উপমা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ঐক্য ধরে রাখতে সচেতন প্রচেষ্টা লাগে। অবহেলা করলে বিভাজন বাড়তেই পারে।
তাই আমার প্রত্যাশা খুব সরল। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকুক, কিন্তু মুসলমান মুসলমানকে শত্রু বানাবেন না। জামায়াতের সঙ্গে মতভেদ থাকুক, কিন্তু প্রত্যেক কর্মীকে এক কথায় গোমরাহ বলা না হোক। তাবলিগের সঙ্গে মতভেদ থাকুক, কিন্তু তাবলিগের প্রত্যেক মানুষকে একই রায়ে বিচার করা না হোক। হেফাজতের সঙ্গে মতভেদ থাকুক, কিন্তু তাদের প্রতিটি কর্মীকে সন্দেহের চোখে দেখা না হোক। আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকুক, কিন্তু ইলমের আদব যেন হারিয়ে না যায়।
শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, ইসলাম কোনো দলের সম্পত্তি নয়। ইসলাম কোনো নির্বাচনী প্রতীকের মধ্যে বন্দী নয়, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক প্রকল্পের নামও নয়। ইসলাম আল্লাহর দ্বীন। আর আমরা সবাই সেই দ্বীনের অনুসারী হওয়ার চেষ্টা করা মানুষ। ভুল করি, সংশোধিত হই, মতপার্থক্য করি এবং আবারও সত্য ও ন্যায়ের দিকে ফিরে আসি।
ঐক্য তাই একরূপতা নয়। ঐক্য হলো ভিন্নতার মধ্যেও সত্য, ন্যায় ও বৃহত্তর কল্যাণের জায়গায় একসঙ্গে দাঁড়াতে পারা। সেই ঐক্য যেন অহংকার, দলীয় সংকীর্ণতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের এনট্রপিতে হারিয়ে না যায়।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী