
সুপ্রভাত সিডনি রিপোর্ট: গত ২২ জুলাই ২০২৬, বুধবার রাত আনুমানিক ৯:৪৫ মিনিটে সিডনির ল্যাকেম্বার ম্যাকডোনাল্ড স্ট্রিটস্থ নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মুহতারাম এবিএম শাহাবুদ্দিন (৭৮)। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
অস্ট্রেলিয়ায় দ্বীনের দাওয়াতের অন্যতম অগ্রদূত এই মহৎ প্রাণ মানুষটি দীর্ঘদিন যাবত বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় শয্যাশায়ী ছিলেন। হাসপাতাল থেকে ফিরে লম্বা সময় তিনি বাসায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক, সরল এবং নম্র স্বভাবের এক ব্যক্তিত্ব। ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি, মালয় ও কুর্দিশ সহ বহু ভাষায় তাঁর অগাধ দখল ছিল; ভাষাগুলো তিনি প্রায় মাতৃভাষার মতোই প্রাঞ্জল ভাবে বলতে পারতেন।
তিনি বুয়েট (BUET) থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে গমন করেন। সেখানে দীর্ঘদিন পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ শেষে, ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে তিনি স্থায়ীভাবে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন এবং সিডনিকে তাঁর দাওয়াতি কাজের মূল কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেন।
সেই সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় আজকের মতো পর্যাপ্ত মসজিদ বা মুসাল্লা ছিল না। তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে সালাত আদায়ের স্থান বা ‘মুসাল্লা’ প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করেন। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা ভিন্নভাষী মানুষদের মাঝে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিতে তিনি নিজেকে উজার করে দিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতেই যে কেউ তাঁর অনুরাগী হয়ে পড়তেন; মুহূর্তেই তিনি পরকে আপন করে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, চমৎকার চরিত্র (আখলাক) এবং মনোমুগ্ধকর বাকপটুতার মাধ্যমে তিনি অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বহু মানুষকে সত্য ও সঠিক পথের দিশা দেখিয়েছেন। পুরো মুসলিম উম্মাহকে নিজ পরিবার হিসেবে আপন করে নিয়ে তিনি দ্বীনের দাওয়াতি কাজে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে গেছেন।
একজন প্রকৌশলী হয়েও জাগতিক খ্যাতি ও বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ করে তিনি জীবনের সিংহভাগ সময় দ্বীনের খেদমতে উৎসর্গ করেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও দ্বীপপুঞ্জে তাঁর দাওয়াতে অসংখ্য অমুসলমান ইসলাম গ্রহণ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মৃত্যুকালে তিনি ঠোঁটে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা:)’ জপতে জপতে এক প্রশান্তি মাখা হাসি নিয়ে পরলোকের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ইন্তেকালের মুহূর্তেও তাঁর মুখে লেগে থাকা সেই হাসি যেন চিরস্থায়ী সাফল্যের এক প্রতিচ্ছবি।
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর সময় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ উচ্চারণ করতে করতে বিদায় নেওয়া আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ এবং ‘হুসনুল খাতিমাহ’ বা উত্তম পরিণতির এক স্পষ্ট নিদর্শন। এ সম্পর্কে প্রিয় নবী রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“যার জীবনের শেষ কথা হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” — সুনান আবু দাউদ
পরবর্তীতে ওবার্নের ‘ওমর মসজিদে’ বিশিষ্ট আরব আলেম শেইখ খালেদের ইমামতিতে মরহুমের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর রুকউড কবরস্থানের মুসলিম সেকশনে তাঁকে দাফন করা হয়:
মরহুমের জানাজায় অস্ট্রেলিয়ার প্রায় প্রতিটি রাজ্য থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা দলে দলে অংশ নেন। বিভিন্ন দেশ ও ভাষার আলেম-ওলামা এবং সাধারণ মুমিনদের উপস্থিতিতে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন মসজিদ, মুসাল্লা এবং ঘরে ঘরে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হচ্ছে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই মহান দাঈকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে কবুল করে নিন। আমীন।