
পূর্ব প্রকাশের পর-
-আমার অজ্ঞতাকে স্বীকার করে নিচ্ছি। সে আমাকে ভালোবাসতো, তাতে কী এমন অসুবিধা হয়েছিল যে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। সে তো আমাকে কোনো ডিস্টার্ব দেয়নি। দেখে শুনে তার একটা বিয়ে দিয়ে দিলেই তো সে সম্মানের সাথে এবাড়ি ছেড়ে চলে যেত। এত জল ঘোলা করার দরকার ছিল না। তাছাড়া সে যে আমাকে ভালোবাসে তা কি আপনাকে বলেছিল?
-সব কথা মুখে বলতে হয় না। কিছু কিছু জিনিস উপলব্ধি করতে হয়। অন্তর দিয়ে বুঝতে হয়।
জয় বলল, ভালো কথা। আমরা যা বুঝিনি আপনি তা বুঝেছিলেন; তাহলে সেদিন ওভাবে নাটক না করে সরাসরি বলতে পারতেন, টোটন আমি রত্নার সাথে তোমার বিবাহ দিতে চাই। তাহলে তো কোনো ঝামেলা থাকতো বলে আমার মনে হয় না। কারণ, আমরা কখনো আপনার অবাধ্য হইনি।
-এটা এমনই একটা বিষয় যা কারো ওপরে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক না। আমিও তা চাই না।
এরপরে আর কারো মুখে কথা সরলো না। টোটন নীরবে উঠে গেলো। টোটন যে বাবার আচরণে রীতিমতো বিরক্ত তা তার উঠে যাওয়ার ভঙ্গি দেখে বোঝা গেলো। শাহরিয়ার এতক্ষণ একটা কথাও বলেনি। এখনও কিছু বলল না। নীরব দর্শকের ভুমিকা পালন করে উঠে গেলো। ওরা চলে যাওয়ার পরে জয় বাবাকে জিজ্ঞাসা করল, রত্না আপা এখন কোথায় তা কি আপনি জানেন?
-জানি।
-কোথায়?
-ওর বন্ধু ইরিনার বাসায়।
জয় অনেকটা বিড়বিড় করে বলল, আপাটা এমনই যে, সে কোনোদিন তার কোনো বন্ধু বান্ধবীকে বাসায় আনতো না। তাদের কাউকেই আমি চিনি না, জানি না।
-ইরিনাদের বাসায় যেতে চাও?
-হাঁ। রত্না আপার সাথে দেখা করতে চাই।
-এই নাম্বারে রিং করলে তাকে পাবে।
বাবা একটা টেলিফোন নম্বর দিলো। নম্বরটা নিয়ে জয় নিজের ঘরে চলে গেলো।
ঔপন্যাসিক আলি আরমান যেন আরেকটা উপন্যাসের কাহিনী নির্মাণ করে চলেছেন। তার উপন্যাসের নায়ক নায়িকা গতানুগতিক চরিত্রের নয়। তারা যেন ভিন্ন চরিত্রের মানুষ। ফলে, তার ইচ্ছামতো ঘটনা এগিয়ে নিতে সমস্যা হচ্ছে।
মিঃ আলি আরমান তার নায়িকার দৃঢ় চরিত্রের কাছে বড্ড অসহায় হয়ে পড়েছেন। তিনি ভেবেছিলেন, একটু নাটুকে কায়দায় উপস্থাপন করলে ওরা দু’জনে তার কাছে স্যারেন্ডার করবে। তখন তিনি ঘটা করে ওদের বিবাহ দেবেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি তার হিসাবে মস্ত একটা ফাঁক রয়ে গেছে।
আলি আরমান নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করেন, তাহলে কি আমি হেরে যাবো?
না না, তা হতে পারে না। আলি আরমান জীবনে কখনো হারেনি। সে হারতে জনে না। তোমরা যে যাই ভাবো না কেন, যে যাই করতে চেষ্টা কর না কেন, আমার ইচ্ছার বাইরে তোমাদের কখনোই যেতে দেবো না। কখনোই না।
আলি আরমান সিগারেট ধরালো। সিগারেট টানতে টানতে ঘরময় পায়চারি করতে লাগল। পরিকল্পনা করতে লাগল কীভাবে রত্না আর টোটনকে পরস্পর কাছাকাছি আনা যায়। ছেলেটা বেশ ঘাড়তেড়া। এজন্য তো তিনি নিজেই দায়ী। তিনি নিজেই তো তাকে এইভাবে তৈরি করেছেন।
১১.
জয় ইরিনার বাসায় ফোন করল। প্রথমে একটা অপরিচিত নারী কণ্ঠ ভেসে এলো, হ্যালো। কে বলছেন প্লিজ?
-আমি জয়।
-আপনি কাকে চাচ্ছেন?
-রত্না আপা আছে?
-হাঁ।
-প্লিজ তাকে একটু দেবেন?
মেয়েটা মাউথপিসে হাত চেপে ধরে ডাকল, এই রত্না- তোর ফোন।
-আমার ফোন! কে জিজ্ঞাসা করেছিস?
-নাম বলছে জয়। চিনিস নাকি?
-জয়! জয় তোর নাম্বার জানলো কী করে?
-তা আমি কী করে বলবো। ইরিনা রিসিভারটা রত্নার হাতে দিলো।
– হ্যালো।
-রত্না আপা, কেমন আছ তুমি?
-ভালো। তুই কেমন আছিস ভাই?
-ভালো না। একদম ভালো না। তুমি চলে যাবার পর থেকে আমার ভীষণ খারাপ লাগছে। আজ সকালে আমি বাবার সাথে ঝগড়া করেছি।
-কেন? ঝগড়া করেছিস কেন?
-তোমার সাথে ওরকম ব্যবহার করলো কেন। তোমাকে তাড়িয়ে দিলো কেন?
-ছি ছি। বাবার সাথে ঝগড়া করে ভালো করিসনি। বাবা তো সবসময় আমাদের ভালো চায়। তিনি যা কিছু করেন, আমাদের ভালোর জন্য করেন।
-তাহলে তুমি চলে গেলে কেন?
-আমি তো শুধু বাবার আদেশ পালন করেছি। তার ওপরে আমার কোনো রাগ বা অভিমান নেই।
-সত্যি বলছো?
-মিথ্যা বলবো কেন?
-তাহলে তুমি বাড়িতে ফিরে এসো।
-নারে! তা হয় না।
-কেন হয় না।
-বাবা না বললে আমি ফিরে যেতে পারি না।
-তাহলে লোকেশান বলো, আমি যাচ্ছি।
-না সোনামণি, তোমার এখানে আসার দরকার নেই। আমি যে এখানে আছি তা তুই জানলি কী করে?
-বাবাই তো নম্বরটা দিলো।
-বাবা দিলো? তিনি কীভাবে জানলেন যে আমি এখানে আছি।
-তা জানি না। আপু তোমাকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছা করছে।
জয়ের কাঁদো কাঁদো কণ্ঠস্বরে রত্নার কান্না আসতে লাগলো। তাহলে এক কাজ করিস, বিকেল পাঁচটার সময়ে আমি বীচে আসবো। আর কাউকে কিছু না বলে চুপি চুপি চলে আসিস।
-আচ্ছা।
-শাহরিয়ার কেমন আছে?
-ভালো নেই। সবসময় মন গোমড়া করে বসে থাকে।
-ওকে একটু দে তো।
-ধরো দিচ্ছি।
শাহরিয়ার অদূরে চুপচাপ বসে ছিল। জয় ইশারা করতেই উঠে এসে রিসিভার হাতে নিলো। হ্যালো-
-কি ব্যাপার রাজকুমার, মনটা ভারি ভারি মনে হচ্ছে?
-তুমি কোথায়?
-জানলে কি আসবে?
-না।
-না কেন?
-তুমি আমাকে আন্ডার এষ্টিমেট করেছো। আমার প্রতি তোমার কোনো আস্থা নেই। বিশ্বাস নেই। আমি একটা দুগ্ধপোষ্য।
-ভুল বোঝ কেন বন্ধু। তুমিই আমার জীবনের প্রথম পুরুষ যাকে আমি সোহাগভরে চুমু খেয়েছি।
-ওটা করেছো আমাকে ইনসাল্ট করে। ওটা তোমার ভালোবাসার প্রকাশ ছিল না।
-ঠিক আছে। রত্না দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
তাহলে তো আমার আর কিছু বলার নেই। আসলে আমার কপালটাই মন্দ। সবাই আমাকে ভুল বোঝে। তুমিও বুঝলে, যাক ভালোই হলো। আমাকে পিছনের দিকে টানার মতো আর কেউ থাকল না। এখন আমি মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়তে পারবো।
-তা তো পারবেই। মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে উড়বে বলেই তো তুমি আমাদের কারো কথা ভাবলে না। আমাদের ছেড়ে গিয়ে বন্ধুর বাসায় উঠেছো। তোমার মান অপমান বোধ নেই, তাই পেরেছো।
-তাহলে আমাকে কী করতে বলছো? এই শহর ছেড়ে চলে যেতে বলছ?
-আমি কিছুই বলছি না। টুডে অর টুমোরো এই শহরের লোক জানবে আলি আরমান পরিবারে ‘ফ্যামিলি ক্রাইসিস’ লেগেছে। আলি আরমান তার মেয়েকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কী কারণে কী ঘটেছে তা তাদের বলে দিতে হবে না, নিজেরাই নিজেদের ইচ্ছামতো কাহিনী বানিয়ে নেবে। সেটা তোমার জন্য, আলি আরমান পরিবারের জন্য কতটা মর্যাদাহানীকর হবে তা কি ভেবে দেখেছো?
রত্না ভেতরে ভেতরে তেতে উঠছিল। এই কথাগুলো নিশ্চয় তার নিজের কথা নয়। এই ধরণের কথা নিশ্চয় পরিবারে আলোচনা হচ্ছে। সে রুক্ষ স্বরে বলল- শোনো, তোমরা পুরুষরা বড্ড একচোখো। শুধু নিজেদেরটাই দেখ। অন্যের দিকটা কখনোই বিবেচনা কর না।
এখন বড় বড় বাত বলছা। কিন্তু সত্যিকারের সমস্যার সম্মুখিন হলে তোমার এই আবেগ উচ্ছ্বাস কতখানি থাকবে তা আল্লাহ মালুম। তুমি কি পারবে তোমার ফ্যামিলিকে কনভিনস করতে? যথাযথ মর্যাদার সাথে আমাকে বধু হিসাবে তোমার ফ্যামিলিতে প্রতিষ্ঠিত করতে?
-আমার বিশ্বাস পারবো। তবে আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে চাই না।
-বলতে চাইছো না, তার কারণ, বলতে পারছো না। তুমি নিজেই যেখানে নিশ্চিত নও, তখন অত বড়াই দেখাচ্ছো কেন? আমি আমার বন্ধুর বাসায় আছি এটা ঠিক। কিন্তু কেন আছি সেটা তোমার জানা উচিত। আমার মতো ভাগ্যহীনা মেয়েরা কখন কোথায় থাকবে তার কোনো গ্যারান্টি যখন নেই, তখন তাদের পক্ষে তোমাদের মতো অত হিসাব নিকাশ মিলিয়ে চলাও সম্ভব নয়।
আমার মতো একটা পরিচয়হীন মেয়ের মান ইজ্জতের সাথে বেঁচে থাকার লড়াইকে তোমরা যত হেলাফেলার চোখে দেখ না কেন, আমার কাছে বাস্তব বড় কঠিন। এতই যখন দরদ, তোমার পরিবারের সাথে কথা বলো। যদি তারা রাজি হয় আমি তোমার সিদ্ধান্তকে মেনে নেবো। এখন রাখছি। বাই।
রিসিভার রেখে দিলে ইরিনা প্রশ্ন করল, শেষে কার সাথে ওভাবে কথা বলছিলি?
-পাগল। পাগল প্রেমিক।
-তাহলে তোরও প্রেমিক আছে? ইরিনা হাসতে লাগল।
চলবে…