দিনে বিএনপি, রাতে আওয়ামী লীগ’: সুবিধাবাদীদের মুখোশ ও রাজনৈতিক বেঈমানি !

বিএনপির অভ্যন্তরে ‘আওয়ামী প্রেমী’ বা ঘাপটি মারা চক্র: প্রপঞ্চ, স্বরূপ ও দলের প্রতি ক্ষয়ক্ষতি

সুপ্রভাত সিডনি প্রতিবেদন: বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দীর্ঘকাল ধরে দুটি প্রধান বিপরীত মেরুর শক্তি। আদর্শগতভাবে দল দুটির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ক্ষমতার সমীকরণ এবং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে বিএনপির অভ্যন্তরে একশ্রেণির সুবিধাবাদী নেতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে সাধারণ নেতাকর্মী ও বিশ্লেষকরা ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘আওয়ামী প্রেমী’, ‘রিমোট কন্ট্রোলড নেতা’ বা ‘ঘাপটি মারা গুপ্ত চক্র’ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন।

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং তাদের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিগত আমলের দুর্নীতি, সন্ত্রাস, হরিলুট, খুন, গুম, হত্যা, আয়নাঘর পরিচালনা, বিডিআর হত্যা, শাপলা চত্বরের গণহত্যা এবং গুলশানের হলি আর্টিজানে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধের কারণে বাংলাদেশ সরকার দলটির সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। তা সত্ত্বেও নিষিদ্ধঘোষিত এই দলটির নেতাকর্মীরা দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের আড়ালে কৌশলে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা করছে।

এই পরিস্থিতিতে তাদেরকে বিশেষ সহযোগিতা করে যাচ্ছে বিএনপি নামধারী কিছু নীতিবিবর্জিত মানুষ, যাদেরকে কথ্য ভাষায় বলা হয় ‘দিনে বিএনপি ও রাতে আওয়ামী লীগ’! বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের মদদে এরা দেশে বুক ফুলিয়ে ব্যবসা করেছে এবং ক্ষমতার প্রভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আসা যাওয়া করেছে , কোনো সমস্যা হয়নি।  মূলত এরা আওয়ামীপ্রেমী সুবিধাবাদী। বিএনপির একশ্রেণির তথাকথিত হাইব্রিড নেতাও এই চক্রের অন্তর্ভুক্ত, যাদের অনেকেই পটপরিবর্তনের পর নানা কৌশলে গা ঢাকা দিয়েছেন বা সটকে পড়েছেন অথবা এদেরকে কোনো পদ পদবি দেয়া হয়নি।

১. কারা এই আওয়ামী প্রেমী বিএনপির নেতাকর্মী?  বাস্তবতা হলো, জন্মলগ্ন থেকেই বিএনপিতে কোনো ‘আওয়ামী পন্থী’ ধারা বা আদর্শিক অনুসারী নেই। তবে এই লেবেলটি যাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তাদের মূলত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:

আসা-যাওয়া চক্রের সুবিধাভোগী: অতীতে যারা সরাসরি আওয়ামী লীগ বা এর অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন কিংবা বিগত সরকারের আমলে টেন্ডারবাজি, চাকরি ও ক্ষমতার অবাধ সুবিধা ভোগ করেছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি ভোল পাল্টে বিএনপির পদ-পদবি বাগিয়ে নিয়েছেন। স্থানীয়ভাবে এদের অনেকেই বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করে রাখেন।

ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বা লিয়াজোঁ রক্ষাকারী নেতৃত্ব: দলের দুর্দিনে বা আন্দোলনের সময় মাঠে যারা নিষ্ক্রিয় ছিলেন, কিন্তু পর্দার আড়ালে সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতাদের সাথে গোপন সলাপরামর্শ বা ব্যবসায়িক পার্টনারশিপ বজায় রেখে চলতেন, এমন কিছু মাঝারি ও উচু সারির নেতা।

প্রবাসীর পোশাকে সুবিধাভোগী: প্রবাসের মাটিতে যারা দীর্ঘদিন আওয়ামী ঘরানার সুবিধা, কমিউটার পলিটিক্স কিংবা দূতাবাসের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন; কিন্তু দেশে ক্ষমতার পালাবদলের হাওয়া লাগার সাথে সাথেই বিএনপির বিভিন্ন কমিটিতে পদ পেতে বা বড় বড় শোডাউন করতে লবিং শুরু করেন।

প্রবাসের মাটিতেও আওয়ামী নেতাকর্মীরা নানা অজুহাতে ফের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। অথচ বিএনপির অনেক নেতাকর্মীই বিভিন্ন অজুহাতে ও টালবাহানায় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে সেগুলোকে সফল করে তুলছেন। তাদের এই অদ্ভুত কর্মকাণ্ডের যে সাফাই তারা দেন, তা যেকোনো সাধারণ মানুষের কাছেও হাস্যকর ঠেকে। কিন্তু তারা বুঝতেই পারছেন না যে সমাজে আজ তাদের অবস্থান একজন ‘ক্লাউন’ বা তামাশার পাত্র ছাড়া আর কিছু নয়।

একজন প্রকৃত বিএনপি সমর্থক হয়ে কেন আপনাকে আওয়ামী লীগের সাথে সখ্য রাখতে হবে? কেন তাদের সাথে একাসনে বসতে হবে বা তাদের অনুষ্ঠানে গিয়ে হাসিমুখে সেলফি তুলতে হবে? এমন কী বিপদ আপনার যে শেষ রক্ষা তারাই করবে? যাদের নিজেদেরই আজ রাজনৈতিক অস্তিত্ব সংকটে, তারা আপনাকে কীভাবে রক্ষা করবে?

এরা আসলে নিছক নীতিহীন, বেঈমান ও মীরজাফর ছাড়া আর কিছুই নয়। যারা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে উপস্থিত হন, তাদের মতো মেরুদণ্ডহীনদের সমাজ ও দল থেকে বয়কট করা উচিত।

কেউ কেউ হয়তো বলবেন, “উনি তো একসময়ের পরীক্ষিত ছাত্রনেতা ছিলেন!” ঠিক আছে, অতীতে তিনি কী ছিলেন সেটা বড় কথা নয়; বরং তিনি এখন কী করছেন সেটাই মূল বিবেচ্য বিষয়। কারণ, অতীতে আমরা অনেক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ডিগবাজির খেলা দেখেছি। যারা বলেন তিনি একজন বোনাফাইড কর্মী ছিলেন, তাদের প্রশ্ন করা উচিত, তাহলে আজ তিনি কেন আওয়ামী লীগের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সব কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন? আসলে এই ধরনের মীরজাফররা নিজেদের ব্যক্তিগত হালুয়া-রুটি ও স্বার্থের জন্য গোপনে দলত্যাগ করেছে, যা সাধারণ কর্মীরা হয়তো টের পান না। এরা সুবিধামতো সবাইকে ভুল বুঝিয়ে চলে, কখনো বিএনপি, কখনো জামায়াত, আবার কখনো অন্য কোনো দলে নিজেদের অবস্থান জাহির করতে নানা রঙে রঙিন হয়। যারা নীতিহীন ও সুবিধাবাদী, তারা বিএনপির মুখোশ পরে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মিডিয়ায়  নিজেদের ব্যবসার বিজ্ঞাপন প্রচার করে। দলীয় নানা অনুষ্ঠান আওয়ামী মিডিয়াতে যত্নসহকারে প্রকাশ করে তারা গর্ববোধ করে। অথচ ঘরোয়া বৈঠকে বা অনুষ্ঠানে আওয়ামী নেতাকর্মীদের নিজেদের বাসায় দাওয়াত খাইয়ে, আবার তারাই সুযোগ বুঝে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিরূপ মন্তব্য বা উপহাস করে।

এ ধরনের সুবিধাবাদী আওয়ামীপ্রেমীদের প্রতি সাধারণ মানুষের ঘৃণা দিন দিন বাড়ছে এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদেরকে বয়কটও করা শুরু হয়েছে। সেই দিন আর দূরে নয়, যেদিন এই সুবিধাবাদীরা সব দিক থেকে কুলহারা হয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হবে।

২. দেশে ও প্রবাসে এদেরকে কীভাবে চিনবেন?  এই সুযোগসন্ধানী ও ঘাপটি মারা চক্রকে চিহ্নিত করা খুব একটা কঠিন নয় যদি তাদের অতীত কর্মকাণ্ড ও বর্তমান আচরণ বিশ্লেষণ করা হয়:

আকস্মিক অতি-সক্রিয়তা: যে নেতার বিগত ৫, ১০ বা ১৫ বছর ধরে বিএনপির কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে বা কর্মসূচিতে কোনো খোঁজ ছিল না, মামলা-হামলার শিকার হননি, তিনি হঠাৎ করেই পটপরিবর্তনের পর বিশাল বহর নিয়ে শোডাউন করা শুরু করবেন এবং পদ দখলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠবেন।

বিগত দিনের সুবিধাভোগী চরিত্র: অতীতে যারা সরাসরি প্রতিপক্ষ দলের কোনো নেতার প্রশ্রয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা, ক্ষমতার অপব্যবহার বা প্রভাবে ফুলেফেঁপে উঠেছেন, তাদের অনেকেই রাতারাতি দলীয় ব্যানারে চলে আসেন।

ত্যাগী নেতাকর্মীদের প্রতি বৈরিতা: এরা দলে ঢুকেই দলের পরীক্ষিত, নির্যাতিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের দূরে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। স্থানীয় কমিটিতে হাইব্রিড বা অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে তারা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন।

প্রবাসীর ক্ষেত্রে দ্বিমুখী ভূমিকা: প্রবাসে যারা এতদিন বিএনপির মূল স্রোতের বাইরে ছিলেন কিংবা সরাসরি প্রতিপক্ষের অনুষ্ঠানে সরব উপস্থিতি বজায় রাখতেন, দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর হঠাৎ করেই নিজেকে বড় বিএনপি নেতা হিসেবে জাহির করতে সোশ্যালে বা কমিউনিটিতে অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন, তারা মূলত এই গোত্রেরই অংশ।

৩. দলের জন্য এরা কতটুকু ক্ষতিকর? সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই ‘আওয়ামী প্রেমী’ বা সুবিধাবাদী চক্রটি একটি রাজনৈতিক দলের জন্য সবচেয়ে বড় ‘স্লো পয়জন’ বা মরণব্যাধির মতো কাজ করে। দলীয় শৃঙ্খলা ও ভবিষ্যতের জন্য এরা বহুবিধ  ক্ষতি ডেকে আনে:

ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের মূল্যায়ন ধ্বংস করা: যারা বছরের পর বছর মিথ্যা মামলা খেয়ে, জেল খেটে এবং সর্বস্ব হারিয়ে দলের দুর্দিনেও টিকে ছিলেন, এই সুবিধাবাদীরা পদ দখল করায় তারা চরম হতাশার শিকার হন। এতে দলের মূল ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

দলীয় ইমেজ ও আদর্শের বিচ্যুতি: এদের কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে যে, দল কি তবে শেষ পর্যন্ত অপরাধী বা সুবিধাবাদীদেরই আশ্রয়স্থল? এতে দলের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের যে রাজনৈতিক নৈতিক উচ্চতা, তা ক্ষুণ্ণ হয়।

অন্তর্বর্তী কোন্দল ও গ্রুপিং সৃষ্টি: এই চক্রটি নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দলের ভেতরে গ্রুপিং, লবিং এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল জিইয়ে রাখে। অনেক সময় তারা দলের গোপন কৌশল বা সিদ্ধান্ত প্রতিপক্ষের কাছে পাচার করে দেয় বলেও অভিযোগ ওঠে।

সরকার বা দলের নীতিনির্ধারণে ভুল বার্তা পাঠানো: এদের ভুল তথ্য ও বলয় তৈরির প্রবণতার কারণে কেন্দ্র অনেক সময় মাঠের সঠিক চিত্রটি পায় না, যা দীর্ঘমেয়াদে দলের রাজনৈতিক কৌশলকে ব্যর্থ করে দিতে পারে।

একটি বড় রাজনৈতিক দলে বিভিন্ন মতের ও পথের মানুষ আসা স্বাভাবিক, কিন্তু আদর্শহীন ও সুযোগসন্ধানী অনুপ্রবেশকারীদের কারণে ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর মূল স্পিরিট নষ্ট হয়। বিএনপি বা যেকোনো দলের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব এবং জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠার জন্য এই ‘আওয়ামী প্রেমী’ বা ঘাপটি মারা হাইব্রিড চক্রকে কঠোরহস্তে ফিল্টার বা ছেঁটে ফেলা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায়, ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত দলের সফলতা এই সুবিধাবাদীদের জন্যই বারবার হোঁচট খাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *