শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাসুলুল্লাহর (সা.) ভূমিকা

আবু বক্কার সিদ্দিক জনি: রাসুল (সা.) ছিলেন মানবতার মুক্তিদূত ও ত্রাণকর্তা। তিনি এমন এক সময়ে এই পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন, যখন পৃথিবী ছিল ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন। মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্বের কোনো লেশমাত্র ছিল না। সর্বদা হানাহানি, লুটতরাজ, ব্যভিচার ও নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য পাপকাজ তখন অহরহ ঘটত। মোটকথা, পৃথিবীতে তখন খুবই নাজুক অবস্থা বিরাজ করছিল। এমন চরম সংকটময় মুহূর্তে মহান আল্লাহ তাঁকে (সা.) প্রতিনিধিরূপে দুনিয়ায় প্রেরণ করলেন। তিনি (সা.) এসে সমগ্র দুনিয়ার মানুষকে এক পতাকার নিচে সমবেত করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করলেন, যার নজির পৃথিবীতে আর নেই। আর তাই রাসুল (সা.) সম্পর্কে নোবেলজয়ী সাহিত্যিক জর্জ বার্নার্ড শ যথার্থই বলেছেন— “মুহাম্মদ (সা.) মানবজাতির ত্রাণকর্তা ছিলেন। সকল মানুষের জন্য তিনি ছিলেন করুণাস্বরূপ। তিনি ছিলেন মানুষের আদর্শ ও আশীর্বাদস্বরূপ। আমি আশ্চর্য হয়ে এই মানুষটিকে অধ্যয়ন করেছি এবং আমার মতে তাঁকে অবশ্যই মানবতার উদ্ধারকারী বলতে হবে।”
তৎকালীন প্রেক্ষাপট:
রাসুল (সা.)-এর আগমনের প্রাক্কালে আরবের অবস্থা ছিল চরম শোচনীয়। সর্বদা গোত্রীয় কলহ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাই ছিল মানুষের স্বভাব। নারী জাতির কোনো সামাজিক মর্যাদা ছিল না; তারা তখন কেবল ভোগ্যপণ্যের মতো ব্যবহৃত হতো। এককথায়, তৎকালীন সমাজ ছিল আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকারাচ্ছন্ন।
মরুর বুকে আলো:
চারিদিকে যখন মূর্তিপূজা ও জঘন্য পাপাচার দেদারসে চলছে, তখন মরুর বুকে দেখা দিল এক ঝলমলে আলো। সেই ঐশী আলোতে পুরো পৃথিবী আলোকিত হয়ে গেল। আবদুল মুত্তালিবের ঘরে জন্ম নিলেন সেই মহাকাঙ্ক্ষিত মানব, যাঁর আগমনের অপেক্ষায় আবু বকর, আলী, ওমরসহ গোটা মানবজাতি অধীর আগ্রহে ছিল। সহসা আন্দোলিত হলো আল্লাহর আরশ ও পুরো মহাবিশ্ব। কাবার মূর্তিগুলো ভেঙে পড়ল এবং ফেরেশতারা আনন্দধ্বনি করতে লাগল।
শৈশবের নিরপেক্ষতা ও সততা:
রাসুল (সা.) ছোটবেলা থেকেই আল্লাহর কুদরতে সম্পূর্ণ নিষ্কলুষ ছিলেন। তিনি কখনো পৌত্তলিকতা কিংবা অনৈতিকতার দিকে যাননি। শৈশবে সমবয়সীরা যখন খেলাধুলায় মত্ত থাকত, তখন তিনি সমাজ ও সৃষ্টি নিয়ে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন থাকতেন। কীভাবে এই অশান্ত পৃথিবীকে শান্ত করা যায় সেটিই ছিল তাঁর ধ্যান। তিনি দুগ্ধপানকালেও অলৌকিক ন্যায়বিচারের পরিচয় দিতেন। অর্থাৎ, তিনি সর্বদা দুধমাতা হালিমার এক স্তনের দুধ পান করতেন এবং অপর স্তনটি তাঁর দুধভাইয়ের জন্য রেখে দিতেন। শৈশবের এই অনন্য আচরণই প্রমাণ করে যে, তিনি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ন্যায়বিচারক হবেন।
আল-আমিন উপাধি লাভ:
তৎকালীন আরবে তাঁর মতো এক বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী মানুষ দ্বিতীয় কেউ ছিল না। তিনি ছিলেন পরম আমানতদার, যার কারণে ঘোর অন্ধকারের যুগেও মক্কার পৌত্তলিক সমাজ তাঁকে ‘আল-আমিন’ (পরম বিশ্বস্ত) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। এমনকি নবুয়ত লাভের পর যখন মক্কাবাসী তাঁর ঘোর শত্রু হয়ে দাঁড়ায়, তখনও তারা নিজেদের মূল্যবান সম্পদ তাঁর কাছেই গচ্ছিত রাখত। হিজরতের রাতেও তিনি সেসব আমানত হজরত আলীকে (রা.) বুঝিয়ে দিয়ে মদিনা ত্যাগ করেছিলেন।
শান্তিসংঘ ‘হিলফুল ফুজুল’ গঠন:
আরব সমাজে সংঘটিত দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী ‘হারবুল ফিজার’ বা অন্যায় যুদ্ধ -এর ভয়াবহতা দেখে আরবের শান্তিকামী মানুষ দারুণভাবে বিচলিত হয়ে পড়েন। এই যুদ্ধাবস্থার অবসান এবং সমাজে শান্তি ফেরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বয়স যখন মাত্র ২৫ বছর (মতান্তরে ২০ বছর), তখন তাঁর চাচা যুবায়ের ইবনে আবদুল মুত্তালিবের উদ্যোগে এবং আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের বাসভবনে একদল সুচিন্তাশীল যুবক নিয়ে গঠিত হয় শান্তিসংঘ ‘হিলফুল ফুজুল’। যার মূল ৫টি ধারা ছিল যথাক্রমে:
১. দেশে বা সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
২. বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে বিরাজমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ-বিগ্রহ চিরতরে বন্ধ করা।
৩. অত্যাচারিতকে অত্যাচারীর হাত থেকে রক্ষা করা এবং জুলুম প্রতিরোধ করা।
৪. সমাজের দুর্বল, অসহায়, অনাথ ও এতিমদের সর্বতোভাবে সাহায্য করা।
৫. মক্কায় আগত বিদেশি বণিক ও মুসাফিরদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
হাজরে আসওয়াদ মীমাংসা:
কাবাঘর পুনর্র্নির্মাণকালে পবিত্র ‘হাজরে আসওয়াদ’ বা কালো পাথর স্বস্থানে বসানো নিয়ে আরবের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বাধার উপক্রম হয়। প্রতিটি গোত্রই এই সম্মানের অংশীদার হতে চেয়েছিল। কিন্তু কোনো মীমাংসা না পেয়ে তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। অবশেষে ঘটনাক্রমে সৌভাগ্যপ্রসূত মানবতার বন্ধু হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজের একটি চাদর বিছিয়ে তাতে পাথরটি রাখেন এবং সব গোত্রের প্রধানকে চাদরের কোণ ধরে তুলতে বলেন। এভাবে তিনি সুকৌশলে একটি নিশ্চিত গৃহযুদ্ধ এড়িয়ে শান্তি স্থাপন করেন।
ঐশী বাণীর প্রচার:
চল্লিশ বছর বয়সে রাসুল (সা.) নবুয়ত লাভ করেন এবং প্রচার করতে লাগলেন সত্য ও শান্তির ঐশী বাণী। কিছু সৎ মানুষ তা সানন্দে গ্রহণ করলেও আরবের কায়েমি স্বার্থবাদী পৌত্তলিক সমাজ এই পরম সত্য বাণীকে প্রত্যাখ্যান করে তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে।
দয়ালু নবী:
শাসক বা নেতা হতে হলে তাঁর মধ্যে অবশ্যই দয়া ও সহনশীলতার গুণ থাকতে হবে। আমাদের প্রিয় নবী ছিলেন দয়ার মূর্তপ্রতীক, যাঁর দয়ার কোনো সীমা ছিল না। তিনি চরমতম শত্রুদেরও নির্দ্বিধায় ক্ষমা করে দিতেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি তাঁর সেই সব শত্রুদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন, যারা একসময় তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে বয়কট করেছিল ও হত্যা করতে চেয়েছিল। যুদ্ধবন্দীদের প্রতি তাঁর মানবিক দয়া ইতিহাসে নজিরবিহীন। নিজে না খেয়ে বন্দীদের খাইয়েছেন। এ প্রসঙ্গে গবেষক ই. আলেকজান্ডার পাওয়েল যথার্থই বলেছেন—
“কিন্তু যুদ্ধ বিজয়ের পর মুসলমানরা যে পরিমাণ সহনশীলতা প্রকাশ করেছিলেন, তা দেখে খ্রিস্টান জাতি নিজেদের নিয়ে লজ্জিত হয়।” (ঞযব ঝঃৎঁমমষব ভড়ৎ চড়বিৎ রহ গঁংষরস অংরধ)
মদিনা সনদ ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান:
রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর সেখানকার অবিসংবাদিত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি মদিনার শান্তি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে একটি ঐতিহাসিক মহাসংবিধান প্রণয়ন করেন, যা ‘মদিনা সনদ’ নামে খ্যাত। এই সনদের মাধ্যমে মদিনায় ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। আউস ও খাজরাজ গোত্রের দীর্ঘদিনের সংঘাত দূর হয়ে মদিনা একটি আদর্শ মডেল রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
কোরআনের শাসন ও শান্তি:
রাসুল (সা.)-এর শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল মহাপবিত্র আল-কোরআন। রাষ্ট্র গঠন ও সমাজ সংস্কারে যা প্রয়োজন, তার সবই এখানে বিধৃত ছিল। যখনই কোনো সংকট তৈরি হতো, মহান আল্লাহ ওহির মাধ্যমে সমাধান পাঠাতেন। রাসুল (সা.) স্বয়ং সেই ঐশী বাণী বাস্তবে রূপ দিতেন। যেখানে ইনসাফ ও কোরআনের আইন কায়েম থাকে, সেখানে কোনো জুলুম বা অশান্তি থাকতে পারে না।
ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন:
রাসুল (সা.) শান্তি স্থাপনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন মানবিক ভ্রাতৃত্বের ওপর। হিজরতের পর তিনি মক্কার মুহাজির ও মদিনার আনসারদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের যে অটুট মেলবন্ধন তৈরি করেছিলেন, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘটনা। ঐতিহাসিক ডক্টর জে. এইচ. জে. গ্রিফিথস এ প্রসঙ্গে লিখেছেন—
“ইসলামের সেই উম্মী নবীর ইতিবৃত্ত অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। সেকালের কোনো বৃহৎ পরাশক্তি যে জাতিকে নিজের বশে আনতে পারেনি, সেই উচ্ছৃঙ্খল জাতিকে তিনি আপন ভালোবাসা ও আদর্শে বশীভূত করেছিলেন।”
শান্তি রক্ষার্থে প্রতিরক্ষা ও যুদ্ধ:
রাসুল (সা.)-এর যুদ্ধজীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি কখনো রাজ্য জয় বা আগ্রাসনের জন্য যুদ্ধ করেননি; বরং আত্মরক্ষার্থে ও শান্তি বজায় রাখতে যুদ্ধ করেছেন। মদিনা রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে মক্কার কুরাইশরা জোরপূর্বক যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল। রাসুল (সা.) নিজের প্রতিরক্ষা শক্তিকে সংখ্যা, নিয়মানুবর্তিতা, কঠোর পরিশ্রম ও চারিত্রিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যা শত্রুদের ভীত ও সন্ত্রস্ত করে রাখত। ফলে বিনা রক্তপাতেও অনেক শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে।
হুদাইবিয়ার সন্ধি— শান্তির চূড়ান্ত দলিল:
রাসুল (সা.) যে কতটা শান্তিকামী ছিলেন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হুদাইবিয়ার সন্ধি। আপাতদৃষ্টিতে এই চুক্তির শর্তগুলো মুসলমানদের জন্য পরাজয়জনক মনে হলেও, সুদূরপ্রসারী শান্তির স্বার্থে রাসুল (সা.) তা মেনে নিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে এই সন্ধিকেই ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। যুদ্ধবন্দীদের প্রতি মানবিক আচরণ:
রাসুল (সা.)-এর সমগ্র যুদ্ধজীবনে মাত্র সাড়ে ছয় হাজারের মতো মানুষ বন্দী হয়। এর মধ্যে সিংহভাগ বন্দীকে তিনি কোনো রক্তপাত ছাড়াই মুক্ত করে দেন। ইতিহাস মোতাবেক তিনি মাত্র দুইজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। যুদ্ধের ময়দানে কোনো বন্দীর ওপর নির্যাতন চালানো হয়নি। রাসুল (সা.) বন্দীদের দুঃখ ও কষ্টের কথা শোনার সাথে সাথে তাদের বাঁধন শিথিল বা মুক্ত করার নির্দেশ দিতেন।
যুদ্ধক্ষেত্রে নৈতিকতা বজায় রাখা:
বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মদ (সা.) যুদ্ধক্ষেত্রেও অনন্য মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি সেনাদলকে নির্দেশ দিতেন—
“তোমরা কেউ নিহতদের লাশ বিকৃত করবে না, উপাসনালয়ে আঘাত করবে না, ফসলের ক্ষেত ও গাছপালা জ্বালাবে না এবং নিরপরাধ নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের হত্যা করবে না।”
বদর যুদ্ধে নিহত শত্রুদের লাশও তিনি সসম্মানে দাফন করার ব্যবস্থা করেছিলেন, যা তৎকালীন আরবে অচিন্তনীয় ছিল।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার:
রাসুল (সা.) মদিনা রাষ্ট্রের সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়মিত টহল ব্যবস্থা ও মজবুত সামরিক পাহারা চালু করেন। এটি একজন বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়কের দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে।
নারী অধিকার ও দাসপ্রথার বিলুপ্তি:
আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগে নারীজাতির কোনো সম্মান ছিল না। রাসুল (সা.) ইসলামে নারীর অধিকার ও মর্যাদা সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা করেন। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি নারী জাতির অধিকার আদায়ে পুরুষদের সতর্ক করেন। এছাড়া মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করতে তিনি প্রাচীন দাসপ্রথা বিলুপ্তির পথ প্রশস্ত করেন এবং কৃতদাসদের মুক্ত করাকে শ্রেষ্ঠ সওয়াবের কাজ হিসেবে ঘোষণা করেন।
ন্যায়ভিত্তিক বিচার ব্যবস্থা:
রাসুল (সা.) পক্ষপাতহীনভাবে কোরআনের বিধান মোতাবেক বিচার ফয়সালা করতেন। তাঁর আদালতে মুসলিম ও অমুসলিম সবাই সমান অধিকার পেত। বিখ্যাত গবেষক মাইকেল এইচ. হার্ট তাঁর রচিত ‘ঞযব ১০০’ গ্রন্থে মহানবী (সা.)-কে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে স্থান দেওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষ (রাষ্ট্রীয় ও লৌকিক) উভয় ক্ষেত্রে ইতিহাসের একমাত্র সফল ব্যক্তি।
আইন বাস্তবায়নে কঠোরতা:
রাসুল (সা.) এমন শাসক ছিলেন না, যিনি শুধু আইন প্রণয়ন করে বসে থাকতেন; বরং তা নিজে ও পরিবারে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। একবার কুরাইশ বংশের এক নারী চুরির অপরাধে ধরা পড়লে রাসুল (সা.) তার হাত কাটার জন্য মনস্থির করেন। কিন্তু ওই মহিলার সাজা কমানোর জন্য সুপারিশ করতে হযরত ওসামাকে (রা.) পাঠানো হয়। এতে রাসুল (সা.) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ঐতিহাসিক এক ঘোষণা দেন—
“তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে কারণ তাদের মধ্যকার কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি অপরাধ করলে তারা তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল কেউ অপরাধ করলে শাস্তি দিত। আল্লাহর কসম! আমার মেয়ে ফাতিমাও যদি আজ চুরি করত, তবে আমি মুহাম্মাদ তার হাতও কেটে ফেলতাম।”
বিদায় হজের শান্তির বাণী:
বিদায় হজের প্রাক্কালে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানব জাতির উদ্দেশ্যে যে কালজয়ী ভাষণ দেন, তা মানবাধিকার ও বৈশ্বিক শান্তি স্থাপনের এক শাশ্বত ও আদর্শ দলিল। বর্ণবাদ দূর করা, সুদ প্রথার বিলুপ্তি এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা সম্বলিত এই ভাষণ আজও বিশ্বের জন্য সবার জন্য অনুকরণীয়।
মূল্যায়ন ও উপসংহার:
উপরোক্ত আলোচনা ও ঐতিহাসিক তথ্যের নিরিখে এটি আজ কোনো প্রকার অসংগতি ছাড়াই প্রমাণিত যে, শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভূমিকা মানব সভ্যতার ইতিহাসে অদ্বিতীয়। বর্তমানের এই যুদ্ধবিধ্বস্ত ও মানবিক মূল্যবোধহীন অস্থিতিশীল পৃথিবীতে প্রকৃত শান্তি ফিরিয়ে আনতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। ঐতিহাসিক জর্জ বার্নার্ড শ যথার্থই লিখে গেছেন—
“যদি সমগ্র বিশ্বের বিচিত্র ধর্ম ও মতবাদের মানুষকে কোনো এক সুযোগ্য রাষ্ট্রনায়কের শাসনাধীনে এনে ঐক্যবদ্ধ করা যেত, তবে একমাত্র মুহাম্মদ (সা.)-ই হতেন সেই পরম যোগ্য নেতা, যিনি পৃথিবীর মাঝে প্রকৃত শান্তি ও সমৃদ্ধির বিকাশ ঘটাতে পারতেন।” আল্লাহ আমাদের এই বিশ্বকে ইহুদি জায়নবাদী হিংস্র মানবরুপী পশুদের থেকে হেফাযত করুন। আমিন।

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *