আমাদের আশেপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা যে কোনও বিষয়েই নিজের অগাধ জ্ঞানের দাবি করতে ভালোবাসেন। আমাদের মলুবাবু, অর্থাৎ মলয় ভর তেমনই একজন। সাহিত্য থেকে স্বাস্থ্য, ভূত-প্রেত থেকে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়েই কেউ কিছু বলতে যাক না কেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, ‘জানি, জানি’। আর ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানের তো শেষ নেই! সুযোগ পেলেই অকারণে ইংরেজি শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করতে তিনি বিশেষ পটু। একদিন তাঁদের বাড়ির কাজের মেয়ে এসে বলল- ‘দাদা, বাজারে জিনিসপত্রের দাম খুব বেড়ে গেছে। আমার মাসিক মাইনে একটু বাড়িয়ে দিন।’ মলুবাবু অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন- ‘আই অ্যাপ্রিসিয়েট ইয়োর কনসার্ন।’ তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই কাজের মেয়েটি বিরক্ত গলায় বলে উঠল– ‘এতো ইংরেজি বলার কোনও দরকার নেই। মাইনে বাড়িয়ে দিলেই হবে।’ এ রকম অসংখ্য ঘটনার নায়ক তিনি। তবে গল্প বলার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য পাড়ার ছোটদের কাছে তিনি ‘মলুমামা’ নামেই বেশি পরিচিত। তাঁর আজব স্বভাবের জন্য পাড়ার চায়ের দোকানের আড্ডাতেও তিনি বেশ জনপ্রিয়। স্বাস্থ্য সম্পর্কে মলুবাবু অত্যন্ত সচেতন। তাই রোজ ভোরে তিনি মর্নিং ওয়াকে বের হন। তবে হাঁটা দশ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয় পাড়ার এক চায়ের দোকানে। সেখানে চা, বিস্কুট, সিঙাড়া, কচুরি, সিগারেট আর জমাটি আড্ডা সব মিলিয়ে সকালটা বেশ কেটে যায়। বাড়িতে চা চাইবার সাহস তাঁর নেই, কারণ তাঁর স্ত্রী সকাল আটটার আগে বিছানা থেকেই ওঠেন না। একদিন সকালের আড্ডায় প্রবীণ বড়ুয়া বললেন- ‘এই শহরের ব্যস্ত জীবনটা আর ভালো লাগছে না। দমবন্ধ হয়ে আসে। কয়েক দিনের জন্য খোলামেলা পরিবেশে কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু উপায় তো নেই।’ খগেন কলিতা সঙ্গে সঙ্গে সায় দিলেন- ‘ঠিকই বলেছ। ছোটবেলার গ্রামের দিনগুলো কী সুন্দরই না ছিল!’ এবার বলেন দাস- ‘এত চিন্তার কী আছে? মির্জায় আমাদের পৈতৃক বাড়ি ফাঁকাই পড়ে আছে। আপনারা যদি রাজি থাকেন, তবে কয়েক দিনের জন্য সেখানে ঘুরে আসা যেতে পারে। গ্রামের খোলা হাওয়ায় মন আর শরীর দুটোই একেবারে চাঙ্গা হয়ে যাবে।’ এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিলেন মলুবাবু। এবার তিনি মুখ খুললেন– ‘এর চেয়ে ভালো প্রস্তাব আর কী হতে পারে! শুভস্য শীঘ্রম। আগামী দ্বিতীয় শনিবার- রবিবারেই চলুন, একটা ‘উইকএন্ড ভিলেজ ট্যুর’ হয়ে যাক।’ খগেনবাবু বললেন– ‘আমি রাজি।’ অবশেষে চার বন্ধু ঠিক করলেন, নির্দিষ্ট সপ্তাহান্তে একসঙ্গে গ্রামে গিয়ে দু’দিন ছুটি কাটাবেন। সেই সিদ্ধান্ত নিয়েই সেদিনের আড্ডার ইতি হল।
নির্ধারিত দিনে চার বন্ধু বলেন দাসের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালেন। গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে, রাস্তার ধারে বড় উঠোন পেরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি দোতলা বাড়ি। বাড়িটি বেশ পুরোনো, বাইরে থেকে দেখতে যেন একেবারে ভূতুড়ে প্রাসাদ। তবে বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক দিম্বেশ্বর ঘরদোর খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রেখেছে। আসবাবপত্রও সেই আদ্যিকালের, ভারী, মজবুত আর প্রাচীন আমলের। বৈঠকখানার দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে বলেনবাবুর প্রপিতামহের বিশাল এক তৈলচিত্র। ভদ্রলোক রুচিশীল পোশাক পরে রুপোর মাথাওয়ালা ছড়ি হাতে গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে আছেন। এত বছরের পুরোনো ছবি হয়েও তাঁর চোখ দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। মনে হয় যেন তিনি এখনও জীবিত, সামনে দাঁড়িয়ে সবকিছু লক্ষ্য করছেন। সেই চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে অকারণেই গা ছমছম করে ওঠে। বাড়ির পেছনে আর একটি উঠোন, তারপরেই বড় একটি পুকুর। পুকুরের ওপারে নানা রকম ফলগাছের বাগান। সবই বেশ সুন্দর, শুধু বাগানের পরেই একটি কবরস্থান থাকায় পরিবেশে যেন খানিকটা অস্বস্তির ছায়া নেমে এসেছে। তাঁরা পৌঁছাতেই বাড়ির প্রহরী বীরেন দৌড়ে এসে অভ্যর্থনা জানাল। দিম্বেশ্বর ইতিমধ্যেই জলখাবারের ব্যবস্থা করে রেখেছিল। জলখাবার সেরে সবাই পুকুরপাড়ে মাছ ধরতে বসলেন। মলুবাবু দাবি করতেন মাছ ধরায় তিনি নাকি সিদ্ধহস্ত, কিন্তু সেদিন তাঁর ছিপে একটি মাছও ধরা পড়ল না। উল্টো খগেনবাবুই প্রায় দু’কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ ধরলেন। মাছ ধরা শেষ হলে সবাই পুকুরে নেমে অনেকক্ষণ সাঁতার কাটলেন। ছোটদের মতো জলকেলি আর হাসি-ঠাট্টায় চারদিক মুখর হয়ে উঠল। দিম্বেশ্বর সেই কাতলা মাছ রান্না করে দুপুরের খাবারে পরিবেশন করল। পেট ভরে খাওয়ার পর সবাই কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে শুয়ে পড়লেন। রাতের খাবারের জন্য বলেনবাবু বীরেনকে গ্রাম থেকে দেশি মুরগি কিনে আনতে পাঠালেন। বিকেলে চা খেতে খেতেই ঠিক হল, রাতে সবাই ছাদের ওপরেই শোবেন। খগেনবাবু বললেন- ‘দারুণ হবে! ছোটবেলায় গরমের রাতে আমরা সবাই ছাদে শুতাম। কতদিন পরে আবার সেই আনন্দটা উপভোগ করা যাবে!’ মলুবাবু কবরস্থানের দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে বললেন- ‘রাতে ছাদে শোয়া ঠিক হবে তো?’ প্রবীণবাবু হেসে বললেন- ‘কী ব্যাপার? ভূতের ভয় পাচ্ছ নাকি?’ মলুবাবু বুক চিতিয়ে বললেন- ‘ধুর! আমি আবার ভূতকে ভয় পাই নাকি? ভূত বলে আদৌ কিছু আছে?’
যেমন কথা তেমনই কাজ। ছাদের ওপর চারটি দড়ির খাটিয়া পাতা হল। একটি হারিকেন জ্বালিয়ে চার বন্ধু তাস খেলতে বসলেন। ছাদের এক কোণে দিম্বেশ্বর ও বীরেন রাতের খাবারের জন্য মুরগির মাংস রান্না করতে লাগল। বলেনবাবু আবার একটু শৌখিন মানুষ। সন্ধ্যাবেলায় একটু আধটু না হলে তাঁর যেন চলেই না। তাই সেই ব্যবস্থাও ছিল। রঙিন পানিতে চুমুক দিতে দিতে তাসের আসর জমে উঠল। কিছুক্ষণ পরে মলুবাবু মাংস রান্না কতদূর হল দেখতে গেলেন। গিয়ে দেখেন, দিম্বেশ্বর দিব্যি আরাম করে চিলম টানছে। দৃশ্যটি দেখে মলুবাবুর কলেজ জীবনের পুরোনো স্মৃতি জেগে উঠল। তিনি হেসে বললেন- এই দিম্বেশ্বর, একটু ‘বাবার প্রসাদ’ দাও তো! দিম্বেশ্বর চিলম বাড়িয়ে দিলে মলুবাবুও দু-এক টান মারলেন। এরই মধ্যে রান্না প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। সবাই একসঙ্গে বসে রাতের খাবার খেলেন। খাওয়ার সময় সবাই গল্পগুজব করছিলেন, কিন্তু মলুবাবু আশ্চর্যজনকভাবে চুপচাপ। মনে হচ্ছিল, নেশাটা বোধহয় একটু বেশিই হয়ে গেছে। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে রাত প্রায় দশটার মধ্যেই সবাই শুয়ে পড়লেন। কিন্তু মলুবাবুর ঘুম আসছিল না। মাথাটা যেন অস্বাভাবিক ভারী লাগছিল। চারদিক নিস্তব্ধ। গভীর রাত। হঠাৎ তিনি শুনতে পেলেন- ঠক… ঠক… ঠক… মনে হল, যেন কেউ নীচতলা থেকে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে। শব্দটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ঠিক তাঁর খাটিয়ার পাশে থেমে গেল। তারপর যেন কেউ খাটিয়ার এক দিক তুলে সেটি উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মলুবাবু উঠে বসলেন। দেখলেন তাঁর সামনে একটি আবছা সাদা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। অবিকল বলেনবাবুর প্রপিতামহের সেই তৈলচিত্রের মানুষটির মতো। চোখ দুটো ক্রোধে জ্বলজ্বল করছে। হাতে সেই রুপোর মাথাওয়ালা ছড়ি। ঠিক তখনই তাঁর কানের পাশ দিয়ে বরফ-ঠান্ডা এক ঝলক হাওয়া বয়ে গেল। কারও নাসিকাস্বরের ফিসফিসানি ভেসে এল- ‘মলু… এখান থেকে পালিয়ে যা… না হলে আজ রাতেই তোর মৃত্যু হবে’… এই কথা শুনে মলুবাবু আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। ভয়ে প্রাণপণে সিঁড়ি বেয়ে নেমে রাস্তায় ছুটতে শুরু করলেন। কখন যে দৌড়াতে দৌড়াতে তাঁর লুঙ্গি খুলে পড়ে গিয়েছে, তিনি টেরই পাননি। অন্ধকার রাতে গ্রামের অচেনা গলি পেরিয়ে দিশেহারা হয়ে ছুটতে ছুটতে তিনি শেষ পর্যন্ত একটি পচা, শুকনো পুকুরে গিয়ে পড়লেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই অজ্ঞান হয়ে গেলেন। এদিকে কিছুক্ষণ পরে বীরেন ছাদে এসে বলল- ‘আমি একটু আগে মলুবাবুকে বাড়ি থেকে দৌড়ে বেরিয়ে যেতে দেখেছি।’ সবাই অবাক হয়ে গেলেন। সত্যিই তো, মলুবাবুর খাটিয়া খালি। আর ছাদের এক কোণে শুকোতে দেওয়া দিম্বেশ্বরের সাদা ধুতিটি মাটিতে পড়ে রয়েছে। তিন বন্ধু টর্চ হাতে মলুবাবুকে খুঁজতে বেরোলেন। কিছুদূর গিয়ে রাস্তার ধারে তাঁর লুঙ্গিটি পড়ে থাকতে দেখা গেল। আরও একটু এগোতেই শুকনো পুকুরের মধ্যে অজ্ঞান অবস্থায় মলুবাবুকে পাওয়া গেল। সৌভাগ্যবশত গ্রীষ্মকাল হওয়ায় পুকুরে জল ছিল না। নইলে সেদিন তাঁর প্রাণ বাঁচানো কঠিনই হত। সবাই মিলে তাঁকে তুলে বাড়িতে নিয়ে এলেন। পাশের বাড়ি থেকে জল এনে মুখে-চোখে ছিটিয়ে দিতেই তাঁর জ্ঞান ফিরল। বলেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন- ‘কী হয়েছে? এমন করে দৌড়ে পালালে কেন’? ভয়ে কাঁপা গলায় মলুবাবু শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত ঘটনাই খুলে বললেন। তাঁর কথা শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত খগেনবাবু হেসে বললেন- ‘মলুবাবু, এই বয়সে এত বেশি নেশা করা কিন্তু মোটেই ভালো নয়।’ মলুবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলে অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বললেন- ‘আই অ্যাপ্রিসিয়েট ইয়োর কনসার্ন’।