সুপ্রভাত সিডনি প্রতিবেদন: অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখেন বিশ্বের অসংখ্য মানুষ। বাংলাদেশের বহু পরিবারও এই স্বপ্ন পূরণে বছরের পর বছর সঞ্চয় করে, জমি বিক্রি করে কিংবা ঋণ নিয়ে ভিসার আবেদন করেন। মানুষের এই স্বপ্ন, সরল বিশ্বাস ও অভিবাসন আইন সম্পর্কে সীমিত জ্ঞানকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একশ্রেণির ভুয়া মাইগ্রেশন এজেন্ট, কথিত ভিসা কর্মকর্তা এবং দালালচক্র।
শতভাগ ভিসা, নিশ্চিত পিআর, ভেতরে লোক আছে, বিশেষ কোটায় ভিসা, কিংবা আগে টাকা দিন, কয়েক মাসের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া এ ধরনের প্রতিশ্রুতিই সাধারণত প্রতারণার প্রথম সংকেত। অস্ট্রেলিয়ার কোনো মাইগ্রেশন এজেন্ট, আইনজীবী বা সরকারি কর্মকর্তা ভিসা অনুমোদনের নিশ্চয়তা দিতে পারেন না। ভিসা দেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা শুধু অস্ট্রেলীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
কার কাছ থেকে ভিসা-সংক্রান্ত সহায়তা নেবেন?
অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন আইন অনুযায়ী, অর্থের বিনিময়ে পেশাগত মাইগ্রেশন সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের প্রধানত দু’ধরনের অনুমোদিত পেশাজীবীর শরণাপন্ন হওয়া উচিত—
- OMARA-নিবন্ধিত মাইগ্রেশন এজেন্ট
- অস্ট্রেলিয়ায় অনুমোদিত আইনজীবী
অফিস অব দ্য মাইগ্রেশন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অথরিটি সংক্ষেপে OMARA অস্ট্রেলিয়ার নিবন্ধিত মাইগ্রেশন এজেন্টদের নিয়ন্ত্রণ ও তদারক করে। কোনো ব্যক্তি নিজেকে অস্ট্রেলিয়ার নিবন্ধিত মাইগ্রেশন এজেন্ট দাবি করলে OMARA-র অনলাইন রেজিস্টারে তাঁর নাম ও Migration Agent Registration Number, MARN যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু ভিজিটিং কার্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন, অস্ট্রেলীয় ফোন নম্বর কিংবা অস্ট্রেলিয়ান পাসপোর্ট কারও পেশাগত যোগ্যতার প্রমাণ নয়।
বাংলাদেশে অবস্থানকারী কোনো ব্যক্তি বিদেশি ভিসা পরামর্শক বা এজেন্সি পরিচালনা করলেও তাঁর অস্ট্রেলীয় নিবন্ধনের দাবি আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে। একজনের MARN ব্যবহার করে অন্য কেউ ব্যবসা করছে কি না, ছবির সঙ্গে পরিচয় মিলছে কি না এবং নিবন্ধন বর্তমানে কার্যকর কি না সেটিও দেখা জরুরি।
নিবন্ধিত এজেন্টের দায়িত্ব
OMARA নিবন্ধিত এজেন্টদের নির্ধারিত আচরণবিধি ও পেশাগত মানদণ্ড মেনে চলতে হয়। তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে :
- আবেদনকারীর পরিস্থিতি বিবেচনা করে সৎ ও বাস্তবসম্মত পরামর্শ দেওয়া;
- কাজের পরিধি, পেশাগত ফি ও অন্যান্য ব্যয় লিখিতভাবে জানানো;
- অর্থ গ্রহণের পর যথাযথ রসিদ প্রদান করা;
- আবেদনকারীকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ও সরকারি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানানো;
- ব্যক্তিগত তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথির গোপনীয়তা রক্ষা করা;
- ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা বা বিভ্রান্তিকর প্রতিশ্রুতি না দেওয়া।
এজেন্ট নিয়োগ করলেও আবেদনপত্রে দেওয়া তথ্যের দায় আবেদনকারীর ওপর থেকে সরে যায় না। ভুয়া এজেন্ট যদি মিথ্যা তথ্য, সাজানো চাকরির কাগজ, জাল ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা ভুয়া সম্পর্কের প্রমাণ জমা দেয়, তাহলে আবেদনকারীও গুরুতর পরিণতির মুখোমুখি হতে পারেন। ভিসা প্রত্যাখ্যান বা বাতিল হওয়া, ভবিষ্যৎ আবেদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশে বাধা কিংবা দেশে ফেরত পাঠানোর মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
এজেন্ট নির্বাচনের আগে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা
অস্ট্রেলীয় সরকারের নির্দেশনার আলোকে ভিসাপ্রত্যাশীদের নিম্নলিখিত বিষয়গুলো যাচাই করা উচিত :
১. নিবন্ধন যাচাই করুন: OMARA রেজিস্টারে এজেন্টের পূর্ণ নাম, MARN, যোগাযোগের তথ্য এবং নিবন্ধনের অবস্থা মিলিয়ে দেখুন।
২. পরিচয় ও কার্যালয় নিশ্চিত করুন: অফিসের ঠিকানা, প্রতিষ্ঠানের ABN, ইমেইল, ওয়েবসাইট এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করুন।
৩. লিখিত চুক্তি নিন: কী কাজ করা হবে, কত টাকা লাগবে, কোন খাতে ব্যয় হবে এবং ফেরতের নীতি কী, সবকিছু লিখিত চুক্তিতে থাকতে হবে।
৪. উপযুক্ত ভিসা নিজে বুঝুন: কোন সাবক্লাসে আবেদন হচ্ছে, যোগ্যতার শর্ত কী এবং কী কী নথি জমা পড়ছে, এসব না বুঝে কোনো কাগজে স্বাক্ষর করবেন না।
৫. বায়োমেট্রিকস ও সরকারি প্রক্রিয়া যাচাই করুন: বায়োমেট্রিকস কেবল অনুমোদিত কেন্দ্রে দিন। কোনো এজেন্টের ব্যক্তিগত বাসা বা অচেনা স্থানে পাসপোর্ট ও বায়োমেট্রিক তথ্য দেওয়া বিপজ্জনক।
৬. আবেদন নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখুন: নিজের ইমেইল, আবেদন নম্বর, জমা দেওয়া নথির কপি এবং অর্থপ্রদানের রসিদ সংরক্ষণ করুন। সম্ভব হলে নিজের ImmiAccount এ আবেদনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করুন।
ভুয়া ‘ভিসা কর্মকর্তার’ ভয় দেখানোর কৌশল
প্রতারকেরা অনেক সময় ফোন করে নিজেদের Department of Home Affairs, Australian High Commission, পুলিশ বা ইমিগ্রেশন বিভাগের কর্মকর্তা পরিচয় দেয়। তারা বলতে পারে : ভিসায় সমস্যা হয়েছে, মামলা হয়েছে কিংবা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে টাকা না দিলে গ্রেপ্তার বা বহিষ্কার করা হবে। এরপর ব্যাংক ট্রান্সফার, ক্রিপ্টোকারেন্সি, মানি ট্রান্সফার অথবা গিফট কার্ডের মাধ্যমে অর্থ দাবি করে।
অস্ট্রেলীয় সরকারের Scamwatch সতর্ক করেছে, সরকার হঠাৎ ফোন করে নির্বাসন বা গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে তাৎক্ষণিক অর্থ দাবি করে না। এমন ফোন পেলে কথা না বাড়িয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন। কলারের দেওয়া নম্বরে ফেরত ফোন না করে সরকারি ওয়েবসাইট থেকে যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করুন। ভিসার অবস্থা জানতে Department of Home Affairs-এর Global Service Centre-এ অস্ট্রেলিয়ার ভেতর থেকে ১৩১ ৮৮১ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।
সিডনিতে কথিত প্রতারণার ঘটনা
সুপ্রভাত সিডনির কাছে আসা অভিযোগ ও অনুসন্ধানে এমন একটি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে এক নারী নিজেকে অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশে একাধিক ব্যক্তিকে স্থায়ী ভিসা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর কোনো স্বীকৃত মাইগ্রেশন এজেন্টের যোগ্যতা বা সরকারি পদ ছিল না; কিন্তু অস্ট্রেলীয় পরিচয় ও প্রভাবশালী যোগাযোগের দাবি দেখিয়ে তিনি মানুষের আস্থা অর্জন করেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অস্ট্রেলিয়ার স্থায়ী ভিসার আশ্বাস দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি পুলিশ ও আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আদালতের কার্যক্রম শেষে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা এবং কয়েকজন ভুক্তভোগীকে অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের চক্রের সঙ্গে স্থানীয় দালালও যুক্ত থাকে। তারা অভিবাসন সমস্যায় থাকা ব্যক্তি, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষ কিংবা দ্রুত পিআর পেতে আগ্রহীদের খুঁজে কথিত “বিশেষজ্ঞের” কাছে নিয়ে যায়। বিনিময়ে জনপ্রতি এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
প্রতারণার শিকার হলে কী করবেন?
সন্দেহজনক ভিসা কার্যক্রমের তথ্য Border Watch এর অনলাইন ফরমে জানানো যায় এবং চাইলে পরিচয় গোপন রাখা যায়। এ ছাড়া :
- ভিসা ও নাগরিকত্ববিষয়ক সরকারি তথ্য: ১৩১ ৮৮১
- ভাষাগত সহায়তার জন্য TIS National: ১৩১ ৪৫০
- নিবন্ধিত এজেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ: OMARA
টাকা পাঠিয়ে থাকলে দ্রুত ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। ইমেইল, বার্তা, চুক্তি, রসিদ, ব্যাংক লেনদেন, বিজ্ঞাপন ও কথোপকথনের প্রমাণ মুছে ফেলবেন না।
শেষ কথা
অস্ট্রেলিয়ার ভিসা কোনো ব্যক্তি বিক্রি করতে পারেন না। একজন নিবন্ধিত এজেন্ট বা আইনজীবী আবেদন প্রস্তুত ও আইনি পরামর্শ দিতে পারেন, কিন্তু ফলাফল নিশ্চিত করতে পারেন না। তাই “নিশ্চিত ভিসা” বা “গোপন সরকারি যোগাযোগের” দাবি শুনলেই সতর্ক হোন।
স্বপ্ন দেখুন, কিন্তু সেই স্বপ্নের দায়িত্ব কোনো অচেনা দালালের হাতে তুলে দেবেন না। যাচাই করুন, লিখিত প্রমাণ নিন এবং সরকারি উৎসের ওপর নির্ভর করুন। আপনার একটি সতর্ক সিদ্ধান্ত শুধু অর্থই বাঁচাবে না, রক্ষা করতে পারে আপনার পরিচয়, ভবিষ্যৎ এবং পুরো পরিবারের বহু বছরের স্বপ্ন। Suprovat.ceo@gmail.com