বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন: গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

এম এ ইউসুফ শামীম: ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা, আলোচনা ও অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে। একটি নির্বাচনের ফল শুধু একটি সরকার গঠনই করে না, বরং তা নির্ধারণ করে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ধারা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান। সে কারণেই এবারের নির্বাচনকে ঘিরে জনগণ, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি।

গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি তীব্র মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারের একচোখা কর্মকান্ডে  জনগণ, বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস, আন্দোলন-সমাবেশ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং নির্বাচনকালীন সরকারের ভূমিকা সব মিলিয়ে নির্বাচনী পরিবেশ বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে কোনো নির্বাচন ঠিক মতো হয়নি, দিনের ভোট রাতেই শেষ হয়েছে। বিভিন্ন ধরণের অনিয়ম, পেশী শক্তির লাগাতার প্রয়োগে খুনিলীগ টিকে ছিল। বিরোধী দলগুলোর প্রধান দাবি ছিল, একটি অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা।  এবারের অবস্থায় মানুষের জোর আশার বহিঃপ্রকাশ, সরকার সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই নির্বাচন আয়োজন করছে।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবারে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনই পারে সব পক্ষের আস্থা অর্জন করতে। ভোটার তালিকার হালনাগাদ, প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া, প্রচারণায় সমান সুযোগ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটগ্রহণের দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই কমিশনের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কমিশন যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে, তবে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক অনেকটাই কমবে।

ভোটারদের অংশগ্রহণও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আগের কয়েকটি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে রাজনীতির প্রতি এক ধরনের অনীহা দেখা যাচ্ছে। অথচ তারাই দেশের ভবিষ্যৎ। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, ডিজিটাল সুযোগ এবং সুশাসনের মতো বিষয়গুলো তরুণদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলো যদি এসব ইস্যুতে স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি দেয়, তবে ভোটারদের আগ্রহ বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি উদীয়মান শক্তি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, শান্তিরক্ষা মিশন এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে দেশের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করবে, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক হবে।

সবশেষে বলা যায়, আসন্ন নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি রাজনৈতিক পরীক্ষা নয়, এটি গণতন্ত্রের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। সহিংসতা পরিহার করে, সংলাপ ও সহনশীলতার মাধ্যমে যদি সব পক্ষ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়, তবে এই নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ইতিবাচক অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে। জনগণের প্রত্যাশা একটাই—তাদের ভোটাধিকার যেন বাস্তব অর্থেই প্রতিষ্ঠিত হয়, আর সেই ভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হোক বাংলাদেশের আগামী দিনের পথচলা।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন শুধু দেশের একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি আমাদের  পরিচয়, আবেগ ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি বিষয়। দূরে থেকেও আমরা দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতা গভীর আগ্রহে অনুসরণ বা পর্যবেক্ষন করে থাকি। সেই প্রেক্ষাপটে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কিছু স্পষ্ট আশা ও চাওয়া রয়েছে।

প্রথমত, অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এটাই প্রবাসীদের প্রধান প্রত্যাশা। আমরা চাই  এমন একটি নির্বাচন, যেখানে সব রাজনৈতিক দল সমান সুযোগ পাবে, ভোটাররা ভয়ভীতি ছাড়া ভোট দিতে পারবে এবং ফলাফল নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকবে না। কারণ একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনই পারে দেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে, যা প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্যও সম্মানের বিষয়। তবে অবশ্যই , বিতাড়িত আওয়ামীলীগ ছাড়া হতে হবে এবারের নির্বাচন।

দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংস আন্দোলন ও অনিশ্চয়তা প্রবাসীদের কাছে উদ্বেগের কারণ। আমরা চাই মতের ভিন্নতা থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলো যেন সংলাপ ও সহনশীলতার পথে হাঁটে। একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশই দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পারে।

তৃতীয়ত, প্রবাসীদের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি। কোটি কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি নিয়মিত দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছেন। অথচ এখনো অধিকাংশ প্রবাসীর ভোট দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। আসন্ন নির্বাচন ঘিরে আমাদের  বড় চাওয়া, ভবিষ্যতে প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ব্যালট, অনলাইন ভোটিং বা দূতাবাসভিত্তিক ভোট ব্যবস্থার বাস্তব উদ্যোগ। বর্তমান সরকার যদিও পোস্টাল ভোটের দাবি করছেন , দূতাবাসগুলোর অনীহা, অজ্ঞতা এবং এক ধরনের কর্ম বিমুখের কারনে জনগণ ঠিক মতো পোস্টাল ভোট দিতে পারেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

চতুর্থত, সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা। প্রবাসীরা চান এমন নেতৃত্ব, যারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে, দুর্নীতি কমাবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করবে। কারণ দুর্নীতি ও অনিয়ম শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার প্রভাব প্রবাসীদের জীবনেও পড়ে।

পঞ্চমত, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানমুখী রাজনীতি। অনেক প্রবাসীর পরিবার দেশে বসবাস করে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব ও বৈষম্য তাদের উদ্বিগ্ন করে। তারা চান এমন সরকার, যারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রবাসফেরত কর্মীদের পুনর্বাসনে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করবে।

সবশেষে বলা যায়, প্রবাসী বাংলাদেশিদের আশা খুব জটিল নয়। তারা চান একটি শান্তিপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, যে নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে এবং বিশ্বে দেশের মর্যাদা বাড়াবে। দূরে থেকেও আমাদের  প্রত্যাশা একটাই: একটি এমন বাংলাদেশ, যাকে তারা গর্ব করে নিজের দেশ বলে পরিচয় দিতে পারি।

বাংলাদেশের চরম শত্রু আওয়ামী ভারতলীগ চাচ্ছে -অরাজকতা সৃষ্টি করে যে কোনো কিছুর বিনিময়ে আসন্ন নির্বাচন বানচাল করা , তাই এবারের নির্বাচন একটি বড় চ্যালেঞ্জ -আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, বহিঃ শত্রুর সাথে বন্ধুত্ব করে দেশকে ধ্বংস না করে সবার আগে বাংলাদেশকে প্রাধান্য দিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *