প্রফেসর ডঃ শফিকুর রহমান, বিশেষ প্রতিনিধি, সুপ্রভাত সিডনী : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঢুকলেই আজও যেন শোনা যায় স্লোগানের প্রতিধ্বনি, অনুভব করা যায় উত্তপ্ত সময়ের চাপা গর্জন। রাজু ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, এখানে শুধু ভাস্কর্য নয়—এখানে ইতিহাস দাঁড়িয়ে আছে। সেই ইতিহাসেরই এক নতুন রূপ ‘জুলাই স্মৃতি সংগ্রহশালা’। ডাকসু ভবনের দ্বিতীয় তলায় গড়ে ওঠা এই সংগ্রহশালায় ঢুকতেই বোঝা যায়, এটি নিছক একটি প্রদর্শনী নয়; এটি সময়ের দলিল, মানুষের ত্যাগের স্পর্শযোগ্য রূপ। দেয়ালে টাঙানো ছবিগুলো, কাচের ভেতরে রাখা ব্যক্তিগত জিনিস—সবকিছু যেন জীবন্ত হয়ে দর্শনার্থীর সামনে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়: “আমরা কি ভুলে যাচ্ছি?”
জুলাই আন্দোলনের সূচনাটা ছিল একেবারেই সাধারণ, কিন্তু তার ভেতরে জমে ছিল বহুদিনের ক্ষোভ। কোটা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ অনেকদিনের। টিএসসি’র চায়ের দোকানে, লাইব্রেরির করিডরে, ক্লাসের ফাঁকে—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল একটি প্রশ্ন: “যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা বঞ্চিত?” সেই প্রশ্নই একদিন প্ল্যাকার্ডে রূপ নেয়। কয়েকজন শিক্ষার্থীর ছোট্ট প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে। প্রথম দিকে কেউ ভাবেনি এটি এত বড় রূপ নেবে; কিন্তু প্রতিটি প্রতিবাদের ভেতরে ছিল জমে থাকা অসন্তোষের আগুন।
আন্দোলন যখন গতি পেতে শুরু করে, তখনই দেখা যায় এক নতুন চিত্র—“বাংলা ব্লকেড”। শাহবাগ থেকে শুরু করে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা রাস্তায় বসে পড়ে, হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে স্লোগান। শহরের গতি থমকে যায়, কিন্তু এই থেমে যাওয়া যেন এক নতুন জাগরণের সূচনা করে। এক রিকশাচালকের সঙ্গে এক শিক্ষার্থীর কথোপকথন তখন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়—যেখানে জীবিকার প্রশ্নের সঙ্গে ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রশ্ন মিশে যায়। এই সংলাপই প্রমাণ করে, আন্দোলন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি হয়ে উঠেছে মানুষের আন্দোলন।
তবে এই আন্দোলনের সবচেয়ে নাটকীয় মোড় আসে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে। এক সন্ধ্যায় যখন রাজু ভাস্কর্যের সামনে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছিল, তখনই শুরু হয় টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ, গুলিবর্ষণ। মুহূর্তের মধ্যে শান্ত ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। একজন শিক্ষার্থী, যার হাতে তখনও একটি প্ল্যাকার্ড, গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে—এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। সেই একটি মুহূর্ত যেন পুরো আন্দোলনের চেহারা বদলে দেয়। মানুষের মনে ক্ষোভ জমে ওঠে, ভয় ভেঙে যায়, আর প্রতিরোধ হয়ে ওঠে আরও দৃঢ়।
সরকার যখন হল খালি করার নির্দেশ দেয়, তখন অনেকেই ভেবেছিল আন্দোলন ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাতের অন্ধকারে ট্রাঙ্ক হাতে শিক্ষার্থীরা হল ছাড়লেও তাদের মনোবল ভাঙেনি। বরং ক্যাম্পাসের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলনের নতুন রূপ। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট মিছিল, মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা—সবকিছু মিলিয়ে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। এক ছাত্রী যখন বলছিল, “হল ছাড়ছি, আন্দোলন না,” তখন সেটি শুধু একটি বাক্য ছিল না; এটি ছিল এক প্রজন্মের অঙ্গীকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবারও প্রমাণ করে যে এটি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন সকাল শুরু হতো মিছিল দিয়ে, দুপুরে হতো সমাবেশ, আর রাতে চলত পরিকল্পনা। টিএসসি’র সিঁড়িতে বসে শিক্ষার্থীরা পোস্টার লিখত, কেউ আহতদের জন্য ওষুধ সংগ্রহ করত, কেউ সামাজিক মাধ্যমে আপডেট দিত। এই সমন্বিত প্রচেষ্টা আন্দোলনকে একটি সুসংগঠিত রূপ দেয়। এখানে কেউ একা ছিল না; প্রত্যেকে ছিল একটি বৃহৎ সংগ্রামের অংশ।
এই সংগঠনের কেন্দ্রে ছিল ডাকসু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ শুধু আন্দোলনের নেতৃত্বই দেয়নি; এটি ছিল পুরো আন্দোলনের কৌশলগত মেরুদণ্ড। কোথায় কখন কর্মসূচি হবে, কীভাবে যোগাযোগ রাখা হবে, কীভাবে গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করা হবে—সবকিছুই পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়। ডাকসুর নেতারা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা বুঝতে পেরেছিল, এই আন্দোলন শুধু একটি দাবি আদায়ের লড়াই নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা।
আন্দোলন শেষ হওয়ার পর যখন ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে, তখনই সামনে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই ইতিহাস কি সংরক্ষিত হবে? সেই প্রশ্নের উত্তর হিসেবে গড়ে ওঠে ‘জুলাই স্মৃতি সংগ্রহশালা’। ডাকসুর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই সংগ্রহশালা শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখার একটি প্রয়াস। এখানে সংরক্ষিত হয়েছে আন্দোলনে নিহত ও আহতদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র—রক্তমাখা পোশাক, বই, ডায়েরি, মোবাইল ফোন, পরিচয়পত্র। প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি গল্প, একটি জীবন, একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন।
সংগ্রহশালার ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এটি কেবল একটি স্থান নয়—এটি অনুভূতির কেন্দ্র। একটি ভাঙা চশমা, একটি ছেঁড়া ব্যাগ, একটি অসমাপ্ত ডায়েরি—সবকিছু যেন দর্শনার্থীর সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। একটি ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা, “কাল আবার যাবো”—এই একটি বাক্যই যেন পুরো আন্দোলনের প্রতীক। এখানে এসে মানুষ শুধু দেখে না; তারা অনুভব করে, উপলব্ধি করে, এবং নিজেদের সঙ্গে প্রশ্ন করে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যগুলো দেখা যায় যখন শহীদদের পরিবারের সদস্যরা এখানে আসেন। এক মা তাঁর সন্তানের ছবি ছুঁয়ে বলছিলেন, “ও তো শুধু পড়তে গিয়েছিল…”—এই বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে অসীম বেদনা। অন্যদিকে, এক বন্ধু তার হারানো সহপাঠীর স্মৃতি স্মরণ করে বলছিল, “ও সবসময় সামনে থাকত।” এই ব্যক্তিগত স্মৃতিগুলো আন্দোলনের ইতিহাসকে আরও মানবিক করে তোলে।
এই সংগ্রহশালা নতুন প্রজন্মের জন্য একটি শিক্ষার জায়গা হয়ে উঠেছে। যারা আন্দোলনের সময় সরাসরি যুক্ত ছিল না, তারা এখানে এসে ইতিহাসকে স্পর্শ করতে পারে। একদল শিক্ষার্থী ছবি তুলতে তুলতে বলছিল, “আমরা তখন ছোট ছিলাম… এখন বুঝতে পারছি।” এই বোঝাপড়াই সংগ্রহশালার সবচেয়ে বড় সাফল্য। এটি শুধু অতীত সংরক্ষণ করে না; এটি ভবিষ্যতের চেতনা গড়ে তোলে।
শেষ পর্যন্ত, জুলাই আন্দোলন একটি সময়ের ঘটনা হলেও তার প্রভাব সময়ের সীমা অতিক্রম করেছে। এটি আমাদের শিখিয়েছে—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। ‘জুলাই স্মৃতি সংগ্রহশালা’ সেই শক্তির প্রতীক, সেই ইতিহাসের ধারক। এখানে এসে মনে হয়, জুলাই শেষ হয়নি; এটি বেঁচে আছে মানুষের মনে, চেতনায়, এবং প্রতিটি প্রতিরোধের গল্পে। এই সংগ্রহশালা তাই শুধু একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়; এটি একটি চলমান ইতিহাস, যা ভবিষ্যতের পথ দেখাবে।