মাহফুজা আক্তার, সিডনি থেকে: ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল সুদীর্ঘ পনেরো বছর এক দাজ্জাল বাহিনীর কবলে জিম্মি ছিল বাংলাদেশ। যার প্রধান ছিল রক্তপিপাসু,নরহত্যাকারী শেখ হাসিনা, যার হুকুমে শুরু হয়েছিল সারা দেশ জুড়ে গুম,খুন, অপহরণের মাধ্যমে বিরোধী দল নিধন, সীমাহীন দুর্নীতি ও ব্যাংক লুটের মহোৎসব।
এভাবেই দম্ভের সাথে চালিয়ে যান একনায়কতন্ত্রের রাজত্ব । ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসিয়ে দেয়া হয় তার yes man দের । ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট আইন বানিয়ে সৎ ও প্রতিবাদী কন্ঠস্বর থামিয়ে কারাবন্দি করে রাখতেন। ছাত্রলীগ নামে ক্যাডার বাহিনী দিয়ে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করে শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে দেয়া হতো ব্যক্তিগত স্বার্থের অন্যায় মতামত । শেয়ার বাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সর্বশান্ত করা হয় তার দলে থাকা উঁচু স্তরের এলিট শ্রেণির দ্বারা । সেই শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির কথা বিস্মৃত হয়নি দেশের জনগণ আজও। এককথায় অন্যায় অবিচারের সকল উপাদান অপপ্রয়োগ করেন দেশের নিরীহ জনগণের প্রতি। কোনো বিবেকতারিত সমাজ সচেতন নাগরিক আওয়াজ তুলতেই বন্দুকের নলে তার টুটি চেপে ধরা হতো। কারন দেশটা ছিল তার বাবার, আর তিনি উত্তরাধিকারী হিসেবে দেশটা কে পেয়েছিলেন তার বাবা থেকে, তাই তিনি এককভাবে সব ক্ষমতার মালিক হয়েছিলেন। স্বপ্নে বিভোর ছিলেন ২০৪১ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হয়ে থাকার।
কিন্তু বিধি বাম” প্রকৃতির নিয়মে যার শুরু আছে তার শেষ ও আছে। তাই তো কোটা সংস্কার নামক গুটিকয়েক ছাত্রছাত্রীর দাবি আদায়ের আন্দোলন রুপ নিয়েছিল আম জনতার অংশগ্রহণে ভয়াবহ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ যা কিনা পরবর্তীতে একটি যুদ্ধের সূচনা হয় হ্যাঁ, এ যেন নিজ ভ্রাতার রক্তের পিপাসু হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আরেক ভ্রাতা, একই দেশের নির্ভীক নিরস্ত্র দেশের ১৭ কোটি মানুষ বনাম দেশের সন্ত্রাসী সরকার।
ফলাফল-সাধারণ মানুষের ঐতিহাসিক বিজয়। প্রান বাচানো ফরজ বলে দেশ থেকে ভারতে পালিয়ে যায় ফ্যাসিস্ট হাসিনা। তার এই অপমানজনক প্রস্থানে দর্পন চূর্ণ হয়ে যবনিকাপাত ঘটে এক স্বৈরশাসকের।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পুরো জাতি মুক্ত হলো, স্বাদ পেলো নতুন এক স্বাধীনতার। দেশটা কে খুব হালকা অনুভব করলো। শুরু হলো তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে নতুন পদযাত্রা। সকল কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন তারা, তাদের জন্যই দেশটা মুক্ত হয়েছিল জালেম, জুলুমের হাত থেকে। দেশ তখন পুরোপুরি নেতৃত্ব বিহীন গভীর সংকটে, চারিদিকে চলছে লুটপাট, পুলিশের দল সব হাসিনার পদাঙ্ক অনুসরণে থানা থেকে পালিয়ে গেছে আর সে সুযোগে প্রায় সবগুলো থানা লুট হয়েছে। অস্ত্র সহ গুরুত্বপূর্ণ সব মামলার নথিপত্র চুরি হয়ে গেছে। চারিদিকে শুধু ডাকাতির খবর মানুষের চোখের ঘুম হারাম, না ঘুমিয়ে নিজেরাই পাহারা দিচ্ছে বাড়ি, ঘর। দেশের এই বেহাল দশার চরম অবস্থায় জাতির অভিভাবক হিসেবে দেশের বিজ্ঞ, সুচিন্তক সুশীল ব্যক্তিগণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের একমাত্র পছন্দের ব্যক্তিত্ব ডক্টর ইউনূস কে বেছে নেন। তার কাঁধে ভর করে চলতে শুরু করে খোড়া বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাপী তার যে সুখ্যাতি, সম্মান আর যুগোপযোগী উদ্যোগে ও তার ব্যাপক পরিচিতির সুবাদে দেশের শুন্য ঝুলি টা নানাবিধ সাফল্যে যেই না একটু ভরতে শুরু হয় ঠিক তখনই ব্যাঙের ছাতার মতো গজানো দেশের আনাচে কানাচে যত ছোট, বড় সব রাজনৈতিক দলগুলির নির্বাচনের ঘ্যান ঘ্যান। একটা কথা না বললেই নয়, সে সময় সব জায়গায় সবার মুখে একটাই টপিক “দখল আর চাঁদাবাজি”।
২০২৬ ডক্টর ইউনুসের আমলের মেয়াদকাল শেষ হবার লগ্ন, ইতিমধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এন সি পি নামক একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের তরুণ প্রজন্ম, বয়োজ্যেষ্ঠসহ সব নাগরিকের মনে প্রত্যাশা নতুন কিছুর, ভিন্ন কিছুর যা পুরাতন চিরাচরিত ভঙ্গুর অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের পুব দিগন্তে উদিত হবে অফুরন্ত সম্ভাবনার এক নতুন সর্ণোউজ্বল সোনালি সূর্য। অবশেষে ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত, কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হন বি এন পি।
প্রায় ১৭ বছরের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি সরকার গঠন করেন। জাতীয় মহান সংসদ এখন জ্ঞানী, গুণী ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বে ভরপুর ঠাসা। যদি বলি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নিখুঁত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সফল অর্জন বর্তমান সরকার তা কি ভূল হবে, না এটা কোন কথার কথা নয়, এটা নির্বাচন এনালাইসিস ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতামত ও বি এন পির দাবি। বাংলাদেশের সচেতন ভোটারদের পছন্দ ও আস্থার শীর্ষে থাকা দলটি আজ ক্ষমতায়। তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সুনিপুণ কর্মদক্ষতা ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় দেশের উন্নয়ন, সুশাসন সর্বত্র সাফল্য দৃশ্যত হবে এটাই তো প্রত্যাশা। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও তার প্রধান কে বলছি, তিনি যেন নিকট অতীত ভুলে না যান, কিভাবে তিনি নির্বাসনের দুরবস্থা থেকে মুক্তি পেয়েছেন, কীভাবে তার দেশে ফেরার পথটা সুগম হয়েছে, আর কাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে তার দলটি আজ ক্ষমতার মসনদে বসে তৃপ্ত হাসি হাসছে। দেশের আঠারো কোটি জনগণ তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ও কর্মকাণ্ডের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখছে, সুতরাং তাদের উচিত হবে দেশের স্বার্থে ও জনগণের হিত ও কল্যাণ সাধনে ক্ষুদ্র হতে বৃহত্তর সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে জনমত যাচাই করা এবং জনগণের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়া যাতে করে দেশের মানুষের এই সরকারের প্রতি স্বচ্ছ ধারণা থাকে ও তাদের নিয়তে কোনো সন্দেহ না হয়। আর এভাবেই বি এন পি সরকারের দেশ পরিচালনার পথ সহজ হবে ও তাদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত হবে আর দেশে আসবে স্হিতিশীলতা।