মোহাম্মদ আলম ফরিদ: ঈদ শেষ হয়েছে। কোরবানির ঈদের রেশটুকু এখনও কাটেনি। সিডনির আকাশে তখনও মেঘের ছায়া। হাতে ফোন। হোয়াটসঅ্যাপে একের পর এক মেসেজ আসছে। বাংলাদেশের রাজনীতি, ঈদের শুভেচ্ছা, কোরবানির ছবি—সব মিলিয়ে ভার্চুয়াল জগত যেন বাস্তবের চেয়েও বেশি সরব।
ঠিক তখনই একজন একটি ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করল।
পোস্টটি ছিল দেশের একজন প্রসিদ্ধ আলেমকে নিয়ে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক সাহেব। পোস্টের ভাষা ছিল তীব্র, আবেগপূর্ণ, কখনো কখনো রাগে কাঁপা। অভিযোগ—তিনি নাকি দেশের অনেক অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন না। রাজনৈতিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, খুন, ধর্ষণ—এসব বিষয়ে তিনি প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। অথচ নির্বাচনের আগে কিছু বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন। লেখকের প্রশ্ন—“একজন ইমামের কাজ কি শুধু নামাজ পড়ানো, নাকি মিম্বরে দাঁড়িয়ে সত্য বলা?”
আমি পোস্টটি কয়েকবার পড়লাম।
আমার ভেতরে একধরনের অস্বস্তি তৈরি হলো। কারণ আমি জানি, বাংলাদেশের এই আলেম কেবল বইয়ের মানুষ নন। তিনি বহু বছর ধরে সমাজের নানা অবক্ষয়, সুদ, দুর্নীতি, নৈতিক অবনতি, পারিবারিক ভাঙন, ধর্মবিদ্বেষ, মিডিয়ার অশ্লীলতা, শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সংকট নিয়ে লিখে, বলে এবং শিক্ষা দিয়ে আসছেন। কিন্তু আজকের যুগে একটি অদ্ভুত সমস্যা তৈরি হয়েছে—যা ভাইরাল হয় না, মানুষ মনে করে তা কখনো বলা হয়নি।
আমি ছোট্ট একটি উত্তর লিখলাম—
“মুফতি আব্দুল মালিক সাহেবের সমালোচনা করার আগে অনেক কিছু বিবেচনায় নেওয়া উচিত। লোকজনের মুখ আছে, হাতে মোবাইল আছে—সমালোচনা তো থামবে না।
মুফতি সাহেবের প্রতিটি কথা মেপে বলা এবং তাঁর আচরণ অনুকরণ করার জন্য যে যোগ্যতা প্রয়োজন, তা আমাদের অনেকেরই নেই।
সমালোচনা করতেও যে যোগ্যতা লাগে, এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আমারও সেই জ্ঞানবুদ্ধি লোপ পাচ্ছে। কারণ আমি এখন হয়তো আর নিজের ক্রিটিক্যাল থিংকিং ব্যবহার করি না; শুধু অন্যের পোস্ট শেয়ার করি।”
মেসেজ পাঠিয়ে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম।
কিন্তু খুব বেশি সময় লাগল না উত্তর আসতে।
আরেকজন লিখলেন—“নিজেই একটু চিন্তা করেন। খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি—এসবের বিরুদ্ধে উনি কোথায় কী বলেছেন? আমাদের পূর্বসূরি ইমামরা শাসকের ভয় করেননি। আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম আহমদ, ইমাম শাফেয়ি, ইবনে তাইমিয়া—তারা সত্য কথা বলেছেন। এখন দেখতে হবে আজকের মুফতিদের কথা ইসলামের পক্ষে যায় নাকি বিপক্ষে।”
আমি ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তার কথার মধ্যে আবেগ ছিল, হতাশা ছিল, কিন্তু একধরনের সরলীকরণও ছিল। ইতিহাসের মহান ইমামদের নাম উচ্চারণ করা সহজ, কিন্তু তাদের যুগ ও বাস্তবতা বোঝা কঠিন। সমালোচকদের প্রশ্নও পুরোপুরি অমূলক নয়। জনজীবনে অন্যায়-অবিচার বৃদ্ধি পেলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আলেমদের কাছ থেকে স্পষ্ট নৈতিক অবস্থান প্রত্যাশা করে, এবং ইতিহাসে বহু আলেম সেই ভূমিকা পালন করেছেন। তবে বিতর্কটি মূলত এ নিয়ে যে, সেই দায়িত্ব সবসময় কি জনসমক্ষে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষায় প্রকাশ পেতে হবে, নাকি শিক্ষা, নসিহত ও অন্যান্য উপায়েও তা পালন করা যেতে পারে?
আমি ভাবতে লাগলাম—আমরা আসলে কাকে বিচার করছি? একজন মানুষকে, নাকি তার সম্পর্কে আমাদের তৈরি করা ধারণাকে?
মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেকের জীবন যদি একটু দেখা হয়, তাহলে বোঝা যায় তিনি রাতারাতি আলোচনায় আসা কোনো বক্তা নন। ১৯৬৯ সালে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার সারাশপুর গ্রামের এক দ্বীনি ও শিক্ষানুরাগী পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা মাওলানা শামসুল হক ছিলেন একজন আলেম। শৈশবেই তিনি কুরআন, আরবি ভাষা ও ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হন। পরে চাঁদপুরের খেড়িহর কওমি মাদরাসায় অধ্যয়ন শেষে পাকিস্তানের খ্যাতনামা জামিয়াতুল উলূমুল ইসলামিয়া (বানুরী টাউন)-এ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। সেখানে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করার পর হাদিসশাস্ত্রে বিশেষায়িত শিক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীতে দারুল উলূম করাচিতে মুফতি তাকী উসমানীর তত্ত্বাবধানে ফিকহ ও ইফতার উচ্চতর শিক্ষা অর্জন করেন।
এরপর সৌদি আরবে গিয়ে তিনি প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহর তত্ত্বাবধানে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন। এই দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রা তাঁকে শুধু একজন বক্তা নয়, একজন গবেষক, লেখক ও মুহাদ্দিস হিসেবে গড়ে তোলে।
১৯৯৬ সালে তিনি ঢাকায় মারকাযুদ দাওয়াহ আল-ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাসচিব ও উলূমুল হাদিস বিভাগের প্রধান। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে শাইখুল হাদিস হিসেবে শিক্ষকতা করে আসছেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত মাসিক আল-কাউসার বাংলা ভাষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাধর্মী ইসলামী সাময়িকী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
জাতীয় পর্যায়েও তিনি নানা দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা কমিশনের সদস্য, জাতীয় চাঁদ দেখা উপ-কমিটির প্রধান এবং জাতীয় মুফতি বোর্ডের সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর ২০২৪ সালে তিনি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।
শিক্ষক, গবেষক, লেখক ও মুফতি—এই চারটি পরিচয়ের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক সমকালীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী হাদিসবিশারদ ও হানাফি ফকিহ। তাঁর জীবন মূলত মিম্বরের চেয়ে বেশি কেটেছে কিতাব, গবেষণা, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার জগতে।
আমি ভাবলাম, একজন মানুষের জীবনের প্রায় চার দশক যদি কিতাব, গবেষণা, শিক্ষা ও দ্বীনি খেদমতে ব্যয় হয়, তাহলে তাকে মূল্যায়নের সময় কি আমাদের একটু বেশি সতর্ক হওয়া উচিত নয়?
আজকের যুগে একজন আলেমের প্রতিটি শব্দ মুহূর্তের মধ্যে ক্লিপ হয়ে যায়। একটি বাক্য কেটে ভাইরাল করা যায়। একটি বক্তব্য দিয়ে মামলা হতে পারে। একটি খুতবা দিয়ে হাজার মানুষের আবেগ জাগানো যায়। আবার একই খুতবা দিয়ে বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি করা যায়।
মানুষ হয়তো এখন আলেমদের কাছ থেকে শুধু জ্ঞান চায় না; তারা রাজনৈতিক সাহসের প্রতীকও খোঁজে। তারা এমন কাউকে চায়, যিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে বজ্রের মতো গর্জে উঠবেন। কিন্তু সব আলেম কি একই ভূমিকার জন্য সৃষ্টি হন?
কেউ আছেন ইমাম আবু হানিফার মতো রাষ্ট্রক্ষমতার সামনে মাথা নত করেননি। কেউ আছেন ইমাম নববীর মতো জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়েছেন। কেউ সমাজ সংস্কারক, কেউ মুজাহিদ, কেউ শিক্ষক, কেউ গবেষক, কেউ নীরব নির্মাতা।
মুফতি আব্দুল মালেককে আমি সেই নীরব নির্মাতাদের কাতারে দেখি—যারা সমাজ গড়েন, প্রতিষ্ঠান গড়েন, বই লেখেন, ছাত্র তৈরি করেন এবং চিন্তার ভিত নির্মাণ করেন।
তাঁর রচিত ‘আল-মাদখাল ইলা উলূমিল হাদিস’ আরবি ভাষায় হাদিসবিজ্ঞানের একটি সুপরিচিত পাঠ্যগ্রন্থ। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর গ্রন্থ ‘আল-মাদখাল’ কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলায় উল্লেখযোগ্য পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। যে দেশে আমরা প্রায়ই অভিযোগ করি মুসলিম বিশ্বে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান কম, সেই দেশের একজন আলেমের লেখা আরবি বই যখন আন্তর্জাতিক পাঠকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, তখন তা নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়।
তাঁর জ্ঞান ও গবেষণার স্বীকৃতি শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর শিক্ষক সিরিয়ার প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ তাঁর মেধা ও গবেষণাশক্তির উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন। ভারতের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা সাঈদ আহমদ পালনপুরী তাঁর ‘আল-মাদখাল’ গ্রন্থের প্রশংসা করে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম শাহ আহমদ শফী ও নূর হুসাইন কাসেমীর মতো ব্যক্তিত্বরাও তাঁকে বাংলাদেশের সৌভাগ্য বলে উল্লেখ করেছেন।
তাঁর ব্যক্তিগত তাকওয়া ও দুনিয়াবিমুখতার বিষয়ে যারা দীর্ঘদিন তাঁর সান্নিধ্যে থেকেছেন, তারা কয়েকটি ঘটনার কথা প্রায়ই উল্লেখ করেন।
প্রথম ঘটনাটি হযরতপুর মাদরাসার জন্য জমি ক্রয়কে কেন্দ্র করে। প্রচলিত আছে, দেশের একজন বিত্তবান ও দ্বীনদার শিল্পপতি মাদরাসার জন্য একটি জমি কিনে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সাধারণত এমন প্রস্তাব পেলে অনেকেই দাতার সামর্থ্য ও সদিচ্ছাকেই যথেষ্ট মনে করেন। কিন্তু বর্ণনা অনুযায়ী, মুফতি সাহেব প্রথমেই ওই শিল্পপতির বিগত প্রায় দশ বছরের আয়কর (ট্যাক্স) এবং যাকাত আদায়ের হিসাব-সংক্রান্ত নথিপত্র দেখতে চান। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নিশ্চিত হওয়া যে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে চাওয়া সম্পদটি হালাল উপায়ে অর্জিত এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শরয়ি দায়িত্বসমূহ যথাযথভাবে আদায় করা হয়েছে। যারা ঘটনাটি বর্ণনা করেন, তারা এটিকে তাঁর তাকওয়া, সতর্কতা এবং আমানতদারির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেন।
দ্বিতীয় ঘটনাটি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিবের দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কখনোই এ পদের জন্য কোনো প্রচেষ্টা চালাননি বা কোনো ধরনের তদবির করেননি। বরং দায়িত্ব গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ, বিজ্ঞ আলেম এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা তাঁকে বারবার অনুরোধ করেছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি প্রথমদিকে এ দায়িত্ব গ্রহণে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে তাঁর সম্মানিত এক উস্তাযের পরামর্শ এবং বৃহত্তর উম্মাহর কল্যাণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তিনি দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হন বলে তাঁর নিকটজনেরা উল্লেখ করেন। এই ঘটনাকে অনেকেই তাঁর পদ-মর্যাদার প্রতি অনাসক্তি এবং দায়িত্ববোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখেন।
ঘটনাদুটি সত্যিই যেমনই ঘটুক না কেন, তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে এগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে—তিনি পদ ও প্রভাবের চেয়ে আমানত, তাকওয়া এবং দায়িত্বের প্রশ্নকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এই ঘটনাগুলোর স্বাধীন দলিলভিত্তিক যাচাই আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি; তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলে এগুলো ব্যাপকভাবে বর্ণিত হয়ে থাকে।
অবশ্য এসব কথা বলার উদ্দেশ্য এই নয় যে তিনি ভুলের ঊর্ধ্বে। ইসলামে নবী-রসুলগণ ছাড়া কোনো মানুষই ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নন। তবে ভুলের সম্ভাবনা থাকা এবং কারও মর্যাদা অস্বীকার করা এক বিষয় নয়। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ), ইমামগণ ও উলামায়ে কেরামের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে তাঁদের বক্তব্য ও ইজতিহাদি মতামত নিয়ে আলোচনা করে। তাই কোনো আলেমের মতামত বা অবস্থানের সমালোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু সমালোচনা ও অবমূল্যায়ন এক বিষয় নয়।
সমস্যা হলো, সোশ্যাল মিডিয়া এই পার্থক্য বোঝে না।
এখানে কেউ যদি প্রতিদিন রাজনৈতিক মন্তব্য না করেন, তাহলে তাকে “নীরব” বলা হয়। কেউ যদি উত্তেজনাপূর্ণ ভাষা ব্যবহার না করেন, তাহলে তাকে “দালাল” বলা হয়। কেউ যদি চিন্তা করে, মেপে কথা বলেন, তাহলে বলা হয় তিনি “ভয় পান”।
কিন্তু মানুষ কি জানে—কত আলেম আছেন যারা ক্যামেরার সামনে না এসে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন? কত আলেম প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেন? কত মানুষকে নীরবে সাহায্য করেন? কত তরুণকে নাস্তিকতা, মাদক ও সহিংসতার পথ থেকে ফিরিয়ে আনেন?
সব কাজ মাইক্রোফোনে হয় না।
আমার মনে পড়ে গেল এক বৃদ্ধ আলেমের কথা। তিনি বলেছিলেন—
“সত্য বলা শুধু চিৎকারের নাম নয়। কখন, কোথায়, কীভাবে কথা বলতে হয়—সেটাও হিকমাহ।”
আজকের পৃথিবীতে হিকমাহ শব্দটি যেন হারিয়ে যাচ্ছে। সবাই তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া চায়। সবাই চায় আগুনের ভাষণ। অথচ আগুন যেমন আলো দেয়, তেমনি ঘরও পুড়িয়ে দিতে পারে।
আমি বন্ধুটিকে আর উত্তর দিলাম না।
কারণ বুঝলাম, এই বিতর্ক শুধু একজন আলেমকে নিয়ে নয়। এটি আমাদের সময়ের এক গভীর অসুখ। আমরা এখন মানুষের পুরো জীবনকে বিচার করি একটি ভাইরাল ক্লিপ দিয়ে। আমরা মনে করি ফেসবুকে না দেখলে কিছু ঘটেইনি। আমরা ভুলে যাই—ইখলাসের অনেক কাজ ক্যামেরার সামনে হয় না।
রাত গভীর হলো।
ফোনের স্ক্রিন নিভে গেল। কিন্তু মনে কয়েকটি প্রশ্ন রয়ে গেল—
আমরা কি সত্যিই আলেমদের কাছ থেকে সত্য চাই, নাকি শুধু আমাদের রাগের প্রতিধ্বনি শুনতে চাই? যে মানুষটি তার জীবনের কয়েক দশক হাদিস, ফিকহ, গবেষণা, শিক্ষা, বই রচনা ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ব্যয় করেছেন, তাকে বিচার করার আগে আমরা কি তার পুরো জীবনটা দেখছি, নাকি শুধু কয়েকটি ভাইরাল পোস্ট?
সম্ভবত কোনো মানুষের মূল্যায়ন করতে হলে তার উচ্চারিত বক্তব্য, নীরব অবদান, জনসম্মুখের ভূমিকা এবং দীর্ঘদিনের কর্মজীবন—সবকিছুকেই একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল সংস্কৃতি আমাদের সেই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রায়ই দূরে সরিয়ে দেয়।
লেখকঃ চিন্তাশীল প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী