অস্ট্রেলিয়ায় ইসলামিক হোম ফাইন্যান্স: উদ্বেগ ও অনিয়ম

ড. এম এমদাদুল হক, শিক্ষক ও মাইক্রোফাইন্স বিশেষজ্ঞ, ক্যানবেরা বিশ্ববিদ্যালয়: গত এক দশক ধরে অস্ট্রেলিয়ায়  ইসলামিক হোম ফাইন্যান্স (গৃহ ঋণ) প্রদানকারী সংস্থার সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যারা শরিয়াহ-সম্মত গৃহঋণ ও বিনিয়োগ পণ্য সরবরাহের দাবি করছেন। এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত বলে থাকে যে তারা প্রচলিত সুদভিত্তিক ঋণের পরিবর্তে Murabaha, Ijarah বা Musharakah-এর মতো ইসলামিক বিধি-বিধান ব্যবহার করে, যা তাদের নিজস্ব শরিয়াহ council বা উপদেষ্টাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।

একটি বিষয় বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে এসব প্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়ার প্রচলিত সুদভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যেই কাজ করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, মূল হোলসেল ফান্ডিং (wholesale funding) বা প্রাতিষ্ঠানিক মূলধন আসে প্রচলিত আর্থিক বাজার বা সুদী নন-ব্যাংক ঋণদাতাদের কাছ থেকে, যদিও গ্রাহকের সঙ্গে করা চুক্তিগুলোকে শরিয়াহ নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখানোর চেষ্টা করা হয়। সম্ভবত ICFAL-ই কিছুটা ভিন্ন কাঠামো বজায় রাখে, যদিও পণ্য ও সময়ভেদে এর চর্চা পরিবর্তিত হতে পারে।

মুসলমানদের উচিত শুধুমাত্র বিপণন বা প্রচারণার দাবির ওপর নির্ভর না করে সচেতন ও তথ্যভিত্তিক আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। শরিয়াহ গভর্নেন্সের মান, শরিয়াহ অডিটের স্বাধীনতা, চুক্তি বিধির প্রকৃত কাঠামো এবং হোলসেল ফান্ডিং-এর উৎস গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। ইসলামিক (Islamic finance) ফাইন্যান্স মানে শুধু গ্রাহক পর্যায়ে সুদ (riba) এড়ানো নয়। Islamic finance মানে স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার, ঝুঁকি-ভাগাভাগি এবং নৈতিক বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা। ইসলামিক অর্থনীতির নামে কোনো ধরনের প্রতারণা, ভুল উপস্থাপন বা অনৈতিক কার্যকলাপ কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম ন্যায়বিচার, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং অর্থনৈতিক শোষণ, জুলম পরিহারকে গুরুত্ব দেয়।

অস্ট্রেলিয়ার ইসলামিক ফাইন্যান্স সেক্টর যত বিকশিত হচ্ছে, ততই শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ স্বচ্ছতা, উন্নত শরিয়াহ গভর্নেন্স এবং অধিকতর স্পষ্টতা (transparency) অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে, যাতে ভোক্তারা (consumers) তাদের আর্থিক প্রয়োজন ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পণ্য নির্বাচন করতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ায় ইসলামিক হোম ফাইন্যান্স ব্যবস্থাগুলো অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত লোন ব্রোকারেজ (loan brokerage) মডেলের মতো কাজ করে, যেখানে Firstmac, Origin বা La Trobe Financial-এর মতো প্রচলিত ঋণদাতাদের মাধ্যমে অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা করা হয় এবং পরে গ্রাহকদেরকে তাদের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। যখন Reserve Bank of Australia সুদের হার বাড়ায়, তখন এসব ইসলামিক প্রতিষ্ঠানও সরাসরি গ্রাহকদের কিস্তি বা সুদের রেট বাড়িয়ে দেয়। এখানে লাভ-ক্ষতির কোন ধারণা বাস্তবে প্রয়োগ করা হয় না, যা ইসলামিক ফাইন্যান্সের মৌলিক নীতি।

ইসলামিক ফাইন্যান্সের প্রকৃত ঝুঁকি-ভাগাভাগির (risk) নীতি বাস্তবে প্রয়োগ হয় না। বরং ঝুঁকি এমনভাবে স্থানান্তর করা হয়, যা প্রচলিত ঋণ ব্যবস্থার সঙ্গে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ। ফলে প্রকৃত অর্থে লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। ইসলামে এমন লাভ বৈধ নয়, যাতে ঝুঁকির উপাদান না থাকে।উপরন্তু অস্ট্রেলিয় এসব Islamic finance প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের ফি গ্রহণ করে—যেমন ডকুমেন্টেশন, সেটেলমেন্ট, অ্যাপ্লিকেশন, ভ্যালুয়েশন, শরিয়াহ সুপারভিশন/লোডিং এবং প্রশাসনিক ফি—যা শুরুতেই গ্রাহকের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে এরা অতিরিক্ত ডিসচার্জ বা এক্সিট ফিও নেয়।

কিছু ইসলামিক সংস্থাতে দেখা যায়, মূল তহবিল আসলে একটি প্রচলিত ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান যেমন Origin Mortgage-এর মাধ্যমে আসে, এরপর ইসলামিক মধ্যস্থতাকারীরা সেটিকে গ্রাহকের জন্য শরিয়াহ কাঠামোতে সাজিয়ে উপস্থাপন করে। এমন পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের জন্য এক ইসলামিক finance প্রদানকারী থেকে অন্যটিতে পরিবর্তন করা জটিল বা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে, যদি তাদের ফান্ডিং কাঠামো একই উৎসের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যেমন Origine Mortgage।

অস্ট্রেলিয়ায় এসব অনিয়ম ও অস্পষ্টতার বিষয়ে উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়ছে এবং ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সে অধিক স্বচ্ছতা ও মানসম্মত নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে। যেহেতু অস্ট্রেলিয়ান সরকার বা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ধর্মীয় অনুশাসন (Sharia compliance) ভিত্তিক আর্থিক পণ্য আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করে না, তাই এই খাতটি মূলত অপর্যবেক্ষিত অবস্থায় থাকে এবং সাধারণ আর্থিক সেবা আইনের অধীনে পরিচালিত হয়, যা মূলত প্রকাশনা (disclosure) ও ভোক্তা সুরক্ষার ওপর জোর দেয়, শরিয়াহ মানদণ্ডের ওপর নয়। ফলে কিছু অসাধু ব্যক্তি মানুষের বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব কারণে শক্তিশালী গভর্নেন্স কাঠামো, ফান্ডিং উৎসের স্পষ্ট প্রকাশ এবং স্বাধীন শরিয়াহ অডিটিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি বাড়ছে। এতে করে ইসলামিক ফাইন্যান্স পণ্যগুলো শুধু কাঠামোগতভাবে নয়, বরং ইসলামী আর্থিক আইনের নৈতিকতা, ঝুঁকি-ভাগাভাগি, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও প্রকৃত প্রয়োজনের প্রতিফলন আরও ভালোভাবে নিশ্চিত করতে পারবে। পাশাপাশি একটি স্বাধীন (ইন্টার-ব্যাংক ধরনের) মুসলিম কো-অপারেটিভ কর্তৃপক্ষ বা বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন, যেখানে শরিয়াহ স্কলার ও ইসলামিক অর্থনীতিবিদরা থাকবেন, যারা ইসলামিক ফাইন্যান্স প্রদানকারীদের মূল্যায়ন বা রেটিং দিতে পারবেন, যেমন credit rating agency রা করে থাকে। UK ও USA তে এই আদলে কিছু কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *