
আয়াজ আহমাদ বাঙালি: রাশিয়ায় ইসলাম ও মুসলিম সমাজ এক দীর্ঘ ইতিহাস ও বৈচিত্র্যময় বাস্তবতার ধারক। বর্তমানে দেশটিতে ২.৫ কোটির বেশি মুসলিম বসবাস করেন। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার আনুমানিক ১৫%-২০%। ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যার দিক থেকে রাশিয়া শীর্ষস্থানীয়।রাশিয়ার মুসলিম জনগোষ্ঠী প্রধানত দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত—নর্থ ককেশাস–যেখানে চেচনিয়া, দাগেস্তান, ইঙ্গুশেতিয়া এবং কাবার্ডিনো-বালকারিয়া অন্তর্ভুক্ত এবং এই প্রদেশগুলোতে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ; অন্যদিকে ভোলগা-উরাল অঞ্চলের তা-তার-স্তান ও বাশ-কোর-তো-স্তানে ঐতিহাসিকভাবে তাতার ও বাশকিরদের বসবাস। পাশাপাশি রাজধানী মস্কোতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ লক্ষ মুসলিম বাস করেন এবং এই শহর ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম জনবহুল শহর হিসেবে বিবেচিত।
রাশিয়ার মুসলিমরা ৪০টির অধিক ভিন্ন ভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে তাতাররা সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী, যারা তুর্কি ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত তাতার ভাষায় কথা বলে। বাশকিররা মূলত বাশকোর্তোস্তানে বসবাস করে এবং তাদের নিজস্ব বাশকির ভাষা রয়েছে। উত্তর ককেশাস অঞ্চলের চেচেন ও ইনগুশরা ঐতিহাসিকভাবে যোদ্ধা জাতি হিসেবে পরিচিত এবং তাদের নিজস্ব ককেশীয় ভাষা রয়েছে। দাগেস্তান অঞ্চলে আবার আভার, কুমিক, লেজগিনসহ বহু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। এছাড়া আজেরি ও কাজাখ জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অভিবাসনের মাধ্যমে রাশিয়ায় এসেছে।
জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে রুশ মুসলিম সমাজে বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। তাতারস্থানের মতো উন্নত অঞ্চলে মুসলিমরা দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির মূল ধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং শিক্ষা ও আর্থিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে উন্নত। তবে নর্থ ককেশাস অঞ্চলে দীর্ঘদিনের সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জীবন কিছুটা কঠিন ছিল, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
রাশিয়ায় ইসলামকে এক “ঐতিহ্যবাহী ধর্ম” হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে—অর্থোডক্স খ্রিস্টধর্ম, বৌদ্ধ ও ইহুদি ধর্মের পাশাপাশি। প্রেসিডেন্ট ভ্লা-দি-মির পু-তিন সাধারণত ইসলামের প্রতি ইতিবাচক অবস্থান প্রদর্শন করেন এবং একাধিকবার উল্লেখ করেছেন, “রাশিয়া একটি মুসলিম দেশও বটে।” রাশান সরকার মসজিদ নির্মাণে সমর্থন প্রদান করে, যার উদাহরণ মস্কো ক্যাথেড্রাল মসজিদ; পাশাপাশি তারা মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে সচেষ্ট। তবে রাশান সরকার “উগ্রপন্থা” বা “রাজনৈতিক ইসলাম” দমনে কঠোর নীতি অনুসরণ করে; কট্টরপন্থী গোষ্ঠী বা বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে কড়া নজরদারিতে রাখা হয়। অনেক সময় বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনের প্রেক্ষাপটে সাধারণ মুসলিমদের ওপর প্রশাসনিক চাপের অভিযোগও ওঠে। সার্বিকভাবে রাশান মুসলিমরা রাশিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ; ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়ার অধিবাসী। তাই রুশ সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তাদের উপস্থিতি ও প্রভাব গভীরভাবে প্রোথিত।
থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের চিত্র
থাইল্যান্ড এক বৌদ্ধপ্রধান দেশ হলেও ইসলাম সেখানে বৃহত্তম সংখ্যালঘু ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫.৪%-১২%-অর্থাৎ আনুমানিক ৭৫ লক্ষ মানুষ–মুসলিম, যাদের অর্ধেকেরও বেশি বাস করেন দক্ষিণ সীমান্তবর্তী “ডিপ সাউথ” অঞ্চলে, বিশেষ করে পাত্তানি, ইয়ালা, না-রা-থি-ওয়াত এবং সা-তুন প্রদেশে; পাশাপাশি ব্যাংকক ও দেশের কেন্দ্রীয় অংশেও বড় মুসলিম বসতি গড়ে উঠেছে। দক্ষিণাঞ্চলের মুসলিমরা মূলত মালয় বংশোদ্ভূত এবং তারা “ইয়াউই” ভাষায় কথা বলেন, অন্যদিকে ব্যাংকক ও উত্তরাঞ্চলের মুসলিমরা প্রধানত থাই বংশোদ্ভূত এবং থাই ভাষাভাষী; এ ছাড়া চীনা (হাও), পারস্য ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মুসলিমও এখানে বসবাস করেন। ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় থাকলেও দক্ষিণাঞ্চলের প্রদেশগুলোতে পারিবারিক ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে ইসলামি আইন বা শরিয়াহ ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে; দেশের রাজা সকল ধর্মের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বিবেচিত হন এবং সরকার মসজিদ নির্মাণ ও ধর্মীয় শিক্ষায় সহায়তা দেয়। তবে দক্ষিণ থাইল্যান্ডে দীর্ঘদিনের স্বায়ত্তশাসনের দাবি ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে উত্তেজনা বিরাজমান, যদিও ব্যাংককের মতো বড় শহরগুলোতে মুসলিমরা অর্থনৈতিকভাবে সফল এবং বৌদ্ধদের সঙ্গে সহাবস্থানে বসবাস করছেন; পাশাপাশি থাইল্যান্ড বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় হালাল পণ্য রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত।
অন্যদিকে ফিলিপাইনস এশিয়ার একমাত্র ক্যাথলিক-প্রধান দেশ হলেও ইসলাম এখানে ঐতিহাসিকভাবে প্রাচীন। দেশটির মুসলিমরা সম্মিলিতভাবে “মোরো” নামে পরিচিত এবং তাদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬.৪%- ১১%-অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ। তারা প্রধানত দক্ষিণাঞ্চলের মিন-দা-না-ও দ্বীপ ও সুলু আর্কিপেলাগোতে বসবাস করেন, যেখানে বর্তমান স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ব্যাং-সা-মো-রো মুসলিমদের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। মোরো জনগোষ্ঠী প্রায় ১৩টি উপজাতীয় দলে বিভক্ত, যার মধ্যে মাগুইন্দানাও, মারানাও ও তৌসুগ উল্লেখযোগ্য এবং তারা নিজ নিজ আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন। সরকার মুসলিমদের জন্য ব্যাং-সা-মো-রো অ-টো-নো-মাস রি-জিয়ন ইন মু-সলিম মিন-দা-না-ও (BARMM) গঠন করেছে, যার ফলে তারা শিক্ষা ও প্রশাসনে বিশেষ স্বাধীনতা ভোগ করছেন; পাশাপাশি ন্যা-শনাল ক-মি-শন অন মু-সলিম ফি-লি-পি-নোস(NCMF) তাদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে। দেশে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা সরকারি ছুটি হিসেবে পালিত হয়। অতীতে মিন-দা-নাও অঞ্চলে ব্যাপক সংঘর্ষ থাকলেও স্বায়ত্তশাসনের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে; বর্তমানে ফিলিপাইন মুসলিম পর্যটকদের কাছে একটি “মুসলিম-বান্ধব” গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে এবং হালাল পর্যটন খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।
শ্রীলঙ্কার হালচিত্র
শ্রীলঙ্কায় ইসলাম তৃতীয় বৃহত্তম ধর্ম। ২০২৪ সালের আদমশুমারির তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে মুসলিম জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০.৭%, যা পূর্বের ৯.৭% থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্রীলঙ্কার মুসলিম সমাজ মূলত তিনটি প্রধান জাতিগত গোষ্ঠীতে বিভক্ত। এর মধ্যে শ্রী লংকান মুর্স সবচেয়ে বড়, যারা মোট মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ৯৩% এবং ঐতিহাসিকভাবে আরব বণিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বংশধর হিসেবে পরিচিত; তাদের মাতৃভাষা প্রধানত তামিল, যদিও অনেকে সিংহলি ভাষাতেও দক্ষ। শ্রী লংকান মালয়স দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বিশেষত ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে আগত মুসলিমদের বংশধর এবং তারা মালয় ভাষায় কথা বলেন। এছাড়া অল্পসংখ্যক ভারতীয় মুসলিমও আছেন, যারা ভারতের দক্ষিণাঞ্চল থেকে এসে বসতি স্থাপন করেছেন; পাশাপাশি কো-লম-বোতে বোহরা ও খোজা সম্প্রদায়ভুক্ত শিয়া মুসলিমদের উপস্থিতিও রয়েছে।
ভৌগোলিকভাবে মুসলিমরা পুরো দ্বীপজুড়ে বিস্তৃত হলেও তাদের একটি বড় অংশ ইস্টার্ন প্রোভিন্সে কেন্দ্রীভূত। এছাড়া কো-লম-বো, ক্যান্ডি এবং মান্নার ডিস্ট্রিক্টেও উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনবসতি রয়েছে। ২০২৪ সালের শুমারিতে মান্নার জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির দিক থেকে শ্রীলঙ্কার মুসলিমরা ঐতিহাসিকভাবে ব্যবসাবাণিজ্যের জন্য পরিচিত। তবে পূর্বাঞ্চলের অনেক মুসলিম কৃষিকাজ ও মাছ ধরার সঙ্গেও যুক্ত। ধর্মীয়ভাবে এখানকার প্রায় ৯৮% মুসলিম সুন্নি মতাদর্শের অনুসারী, যদিও কিছু সুফি ঐতিহ্যও লক্ষ্য করা যায়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় সিংহলি ও তামিল সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় গড়ে তুলেছেন।
সাংবিধানিকভাবে শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্মকে “সর্বোচ্চ স্থান” দেওয়া হলেও সকল নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকার মুসলিমদের পারিবারিক ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে পৃথক “মুসলিম পার্সোনাল ল” প্রয়োগের সুযোগ দেয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে কিছু মুসলিম সংগঠন নিষিদ্ধ করা, কিংবা ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের মতো কিছু চ্যালেঞ্জের কথা ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম (USCIRF)-র মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো উল্লেখ করেছে। ২০১৯ সালের ইস্টার বোমা হামলার পর সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হলেও বর্তমানে মুসলিমরা শ্রীলঙ্কার মূলধারার শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন।
ভারতে ইসলাম ও মুসলমান
ভারতের মুসলিম সম্প্রদায় দেশটির একটি অত্যন্ত বড়, বৈচিত্র্যময় এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠী। ভারতে ২০১১ সালের জনগণনার পর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন জনগণনা না হলেও বিভিন্ন প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০২৫ সালে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ২০.৫ থেকে ২৩ কোটির মধ্যে। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪.২%-১৫%। ভবিষ্যৎ অনুমান অনুযায়ী যদি এই সংখ্যা প্রায় ৩৫ কোটিতে পৌঁছায়, তবে ভারতের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে তা প্রায় ২২.৫% থেকে ২৩.৫% হবে। উল্লেখ্য, অধিকাংশ আন্তর্জাতিক জনমিতিক গবেষণা ও রিপোর্ট অনুযায়ী ইন্দোনেশিয়ায় বিশ্বের সর্বাধিক মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে এবং ভারতের অবস্থান দ্বিতীয়। তবে কিছু ভিন্ন উৎস বা পুরোনো প্রক্ষেপণে ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায় বলে কারও কারও মতে ভারত প্রথম স্থানেও থাকতে পারে। বাস্তবসম্মত ও ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়া প্রথম এবং ভারত দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়। মুসলিমরা ভারতের প্রায় প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকলেও তাদের ঘনত্ব ও সামাজিক চরিত্র অঞ্চলভেদে অনেক আলাদা।
ভৌগোলিক বণ্টনের দিক থেকে উত্তরপ্রদেশে মুসলিম জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৩.৮ থেকে ৪.৫ কোটি। বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা এবং আসামেও মুসলিম উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। কাশ্মীর ভারতের একমাত্র অঞ্চল যেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, প্রায় ৬৮% থেকে ৭০%। অন্যদিকে লক্ষদ্বীপে প্রায় সম্পূর্ণ জনসংখ্যাই মুসলিম, প্রায় ৯৬% এর বেশি। দিল্লি, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু এবং তেলেঙ্গানাতেও গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম জনবসতি রয়েছে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ভারতীয় মুসলিমরা ভাষা, জাতি ও ইতিহাস অনুযায়ী গভীরভাবে বৈচিত্র্যময়। উত্তর ও মধ্য ভারতে অনেক মুসলিম উর্দু ভাষায় কথা বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বাংলা, কেরালায় মালয়ালাম, তামিলনাড়ুতে তামিল, কাশ্মীরে কাশ্মীরি এবং গুজরাট, মহারাষ্ট্র ও তেলুগুভাষী অঞ্চলগুলোতে স্থানীয় ভাষার মুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছে। বৈচিত্র্যই মুসলমানদের ভারতের অন্যতম বহুভাষিক ধর্মীয় সম্প্রদায়ে পরিণত করেছে।
সামাজিক কাঠামোর দিক থেকে ভারতীয় মুসলিম সমাজ সাধারণত তিনটি স্তরে বিভক্ত—আশরাফ, আজলাফ এবং আরজাল। আশরাফরা ঐতিহাসিকভাবে আরব, পারস্য বা মধ্য এশীয় বংশোদ্ভূত দাবি করে এবং তুলনামূলকভাবে উচ্চ সামাজিক অবস্থানে রয়েছে। আজলাফরা মূলত স্থানীয় ধর্মান্তরিত মুসলিম, যারা কৃষি, হস্তশিল্প ও কারিগরি পেশার সাথে যুক্ত। আরজাল অংশকে ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে অনগ্রসর হিসেবে ধরা হয়, যাদেরকে অনেক সময় মুসলিম দলিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই বৈষম্য কমানোর জন্য ‘পাসমান্দা আন্দোলন’ উল্লেখযোগ্যভাবে সক্রিয় হয়েছে, যারা আজলাফ ও আরজাল মুসলিমদের জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার দাবি করছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বড় অংশ স্বনিযুক্ত; ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, লোহালক্কড়, চামড়া শিল্প, এমব্রয়ডারি এবং বিভিন্ন কারিগরি পেশার সাথে যুক্ত। শহরাঞ্চলে তারা ছোট ও মাঝারি ব্যবসার ওপর বেশি নির্ভরশীল। তবে ব্যাংকিং, কর্পোরেট সেক্টর এবং উচ্চপদস্থ সরকারি চাকরিতে তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। বিভিন্ন গবেষণা ও রিপোর্টে দেখা গেছে, মুসলিমদের সরকারি চাকরিতে অংশগ্রহণ প্রায় ৫-৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত।
শিক্ষার ক্ষেত্রে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৯.৫%; জাতীয় গড়ের কাছাকাছি হলেও উচ্চশিক্ষায় মুসলিমদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তির হার ভালো হলেও উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত শিক্ষায় ড্রপআউটের হার বেশি। তবে কেরালার মুসলিমরা এই ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে অনেক এগিয়ে। উত্তরপ্রদেশ, বিহার এবং রাজস্থানের মুসলিম জনগোষ্ঠী শিক্ষার দিক থেকে পিছিয়ে আছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
জনমিতিক দিক থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে তরুণ। তাদের মধ্যক বয়স প্রায় ২২-২৪ বছর; হিন্দু জনগোষ্ঠীর তুলনায় কম। তাই মুসলিমদের ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অতীতে মুসলিমদের মধ্যে জন্মহার তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও সাম্প্রতিক দশকে তা দ্রুত হ্রাস পেয়েছে এবং বর্তমানে মোট প্রজনন হার প্রায় ২.৩ এর কাছাকাছি—ভারতের জাতীয় গড়ের সাথে ধীরে ধীরে সমান হয়ে আসছে।
রাজনৈতিক ও আইনি ক্ষেত্রে ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলেও মুসলিমদের জন্য ব্যক্তিগত আইন বা মুসলিম পার্সোনাল ল প্রযোজ্য, যা বিবাহ, তালাক এবং উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে কার্যকর। একই সঙ্গে ইউনিফর্ম সিভিল কোড (UCC) নিয়ে চলমান বিতর্ক মুসলিম সমাজে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ওয়াকফ সম্পত্তি, ধর্মান্তর বিরোধী আইন এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ভারত সরকার এসব প্রতিবেদনকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রত্যাখ্যান করে এবং দেশের বহুত্ববাদী কাঠামোর উপর গুরুত্ব দেয়।
রাজ্যভিত্তিক চিত্রেও বৈচিত্র্য স্পষ্ট। পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমরা প্রায় ৩৭% জনসংখ্যা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি। আসামে প্রায় ৪২% মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে, যেখানে নাগরিকত্ব ইস্যু ও এনআরসি বড় সামাজিক প্রভাব ফেলেছে। কেরালায় মুসলিমরা শিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত, কাশ্মীরে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও কর্ণাটকে মুসলিমরা ব্যবসা ও নগর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যদিও রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
সাংস্কৃতিকভাবে ভারতীয় মুসলিমরা সুফিবাদ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। চিশতি ও কাদিরিয়া তরিকার প্রভাব, আজমীর শরীফ ও নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মতো দরগাহ এবং ‘গঙ্গা-যমুনা তহজিব’ ভারতের ধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে গঠন করেছে। সুলতানি কীর্তি, নবাবি উৎসর্গ, উর্দু ভাষা, মুঘল স্থাপত্য এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বর্তমানে ভারতীয় মুসলিম সমাজ একদিকে আধুনিক শিক্ষা ও অর্থনীতির মূলধারার সাথে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণভাবে পাসমান্দা আন্দোলন, শিক্ষার আধুনিকীকরণ এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির এক পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া চলছে, যা ভবিষ্যতে ভারতীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর সামাজিক কাঠামোকে আরও প্রভাবিত করতে পারে।
জাপান ও সিঙ্গাপুরে ইসলাম
জাপান ও সিঙ্গাপুরে ইসলামের সামাজিক অবস্থান, জনসংখ্যাগত কাঠামো এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট একে অপরের থেকে ভিন্ন হলেও উভয় দেশেই মুসলিমরা সক্রিয় ও ক্রমবর্ধমান সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে বিদ্যমান।২০২৪-২৫ সালের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী জাপানে প্রায় ৩,৫০,০০০ থেকে ৪,২০,০০০ মুসলিম বসবাস করেন, যাদের প্রায় ৯০% বিদেশি বংশোদ্ভূত—মূলত ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া থেকে আগত। বাকি প্রায় ৫০,০০০ স্থানীয় জাপানি মুসলিম, যারা টোকিও, আইচি, ওসাকা ও কানাগাওয়া অঞ্চলে কেন্দ্রীভূতভাবে বসবাস করেন। তাদের পেশাগত কাঠামোতে বড় একটি অংশ প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে কাজ করে, পাশাপাশি অনেকে ব্যবসা, শিক্ষকতা ও প্রকৌশল খাতে যুক্ত। জাপানের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেও বাস্তব জীবনে মুসলিমদের জন্য কিছু সামাজিক ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে, বিশেষভাবে দাফনের জন্য স্থান সংকট বিদ্যমান, কারণ সেখানে মূলত দাহ প্রথাই বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাপানে ১৬০টিরও বেশি মসজিদ গড়ে উঠেছে। উল্লেখ্য, ‘৮০-র দশকে জাপানে মসজিদের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েকটি। পাশাপাশি হালাল খাদ্য ও হালাল পর্যটনের সুযোগও দ্রুত বাড়ছে এবং এর মাধ্যমে মুসলিম উপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে, সিঙ্গাপুরে ইসলাম তৃতীয় বৃহত্তম ধর্ম হিসেবে স্বীকৃত এবং মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫.৬% মুসলিম। এদের মধ্যে প্রায় ৮০% মালয় জাতিগোষ্ঠীর, প্রায় ১৩% ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং বাকি অংশ চীনা, আরব ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের। সিঙ্গাপুরে মুসলিমরা প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। এছাড়া ব্যবসা ও খাদ্য খাতে তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। ধর্মীয় প্রশাসনের জন্য সরকারিভাবে পরিচালিত ‘মজলিস উগামা ইসলাম সিঙ্গাপুরা’ (MUIS) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং দেশে প্রায় ৭৫টি মসজিদ রয়েছে, যার মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে “মসজিদ সুলতান” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুসলিমরা এখানে পারিবারিক ও বিবাহ সংক্রান্ত বিষয়ে শরিয়াহ আদালতের সীমিত সুবিধাও পান। শিক্ষাক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের মুসলিম সমাজ তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত অগ্রসর। উল্লেখ্য, আধুনিক শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয়ে পরিচালিত মাদরাসা ব্যবস্থা সিঙ্গাপুরে আছে। এখানকার মুসলিমরা মূলত শাফিয়ি মাজহাব অনুসরণ করেন এবং রাষ্ট্রটি ধর্মীয় সহনশীলতা ও বহুত্ববাদী নীতির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত।তাই সিঙ্গাপুরে মুসলিমরা তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত, শিক্ষিত এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সম্প্রদায় হিসেবে অবস্থান করছেন।