728 x 90

ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘাত : ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করার চক্রান্ত! 

কায়সার আহমেদ: হিব্রু বাইবেলকে সূত্র ধরে ইহুদীদের দাবী হলো সেই প্রাচীনকাল থেকেই তারা এখানে (ফিলিস্তিন-ইসরাইল) আছে। মাঝে অন্যত্র নির্বাসিত হলেও এ জায়গার আসল অধিকার তাদেরই। অথচ তাদের সেই ধর্মগ্রন্থমতেই ইহুদীরা এখানে আসার অনেক আগে থেকেই ফিলিস্তিনিরা এ অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা। তাই ইহুদীদের এখানে উড়ে এসে জুড়ে বসা ব্যাপারটা এই অঞ্চলের মুসলিমরা মেনে নিতে একদমই রাজি

কায়সার আহমেদ: হিব্রু বাইবেলকে সূত্র ধরে ইহুদীদের দাবী হলো সেই প্রাচীনকাল থেকেই তারা এখানে (ফিলিস্তিন-ইসরাইল) আছে। মাঝে অন্যত্র নির্বাসিত হলেও এ জায়গার আসল অধিকার তাদেরই। অথচ তাদের সেই ধর্মগ্রন্থমতেই ইহুদীরা এখানে আসার অনেক আগে থেকেই ফিলিস্তিনিরা এ অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা। তাই ইহুদীদের এখানে উড়ে এসে জুড়ে বসা ব্যাপারটা এই অঞ্চলের মুসলিমরা মেনে নিতে একদমই রাজি নয়।  এবং ধর্মগতভাবেই সারা বিশ্বে মুসলিমরা তাদের এ দাবিকে সমর্থন করে। তবে মার্কিন মিত্র হওয়ায় ইসরাইলের ক্ষমতা যে সুবিশাল সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই। ফিলিস্তিনদের উপর অবিরাম চলতে থাকা হামলাগুলো বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়ে যায়- বিশেষ করে গাজার উপর হামলা। প্রতিনিয়ত সেখানে নিরীহ নারী-শিশু মারা যাচ্ছে। কিন্তু অদুর ভবিষ্যতে এ দ্বৈরথ মিমাংশিত হবার কোন ক্ষীণ আশাও দেখা যাচ্ছে না।

এখন ফিলিস্তিনে দখলদার রাষ্ট্র ইসরাইল বর্তমানে যে গণহত্যা চালাচ্ছে তা সার্বজনীনভাবে ও ভুলভাবে ফিলিস্তিনকে বাদ দিয়ে ‘ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধ’ হিসাবে বর্ণনা করা হচ্ছে। যেন ঘটনা এই ৭ই অক্টোবর ২০২৩ এ শুরু! এর মধ্যে কোনোভাবে ৭৫ বছর ধরে ইসরাইলের দখলদারিত্ব, নিপিড়ন ও বর্বরতার শিকার ফিলিস্তিনি জনগনের কোন স্বীকৃতি নেই। কি ঘটছে গাজায়? এটা শুধু গণহত্যা বা জাতিগত বিদ্বেষ হিসেবে বর্ণনা করলে হবে না, এমন ব্যপক ধ্বংসাত্বক এর বাইরেও অন্য কোন বিষয় লুকিয়ে আছে। আর তা হলো ফিলিস্তিনের পরিচয় মুছে ফেলতে চাচ্ছে ইসরাইল। একটা এলাকাকে অবরুদ্ধ করে প্রতিদিন শত শত বোমা নিক্ষেপ করছে, হাজার হাজার নিরাপরাধ নারী শিশু পুরুষকে হত্যা করা হচ্ছে, অসংখ্য বেসামরিক মানুষকে পঙ্গুত্ব বরণ করাচ্ছে; আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নির্বিকার দেখে যাচ্ছে।  ইসরাইলী সরকারের নির্দেশে তাদের সেনাবাহিনী সকল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন সহ সকল বিধিবিধান অমান্য করে চলছে, ফিলিস্তিনের গাজা অংশ দখল করে নিতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে সেটা থামানোর কোন উদ্দোগ নেই আন্তর্জাতিক কোন সংস্থার। উল্টো তারা (জাতিসংঘ সহ কিছু শক্তিমান দেশ) এই অমানবিক নির্মমতা, যুদ্ধাপরাধ বন্ধ করার পদক্ষেপ না নিয়ে ফিলিস্তিনিদের উদ্বাস্তুতা নিশ্চিত করতে তৎপর। এমন প্রচারনা চালাচ্ছে ভিক্টিমের পরিচয় যেনো বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে যায়। গাজার মানুষের এই অবর্ণনীয় কষ্টের প্রতি বিশ্ব নেতাদের অবজ্ঞার নিষ্ঠুরতায় ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে?

একটু ইতিহাসের দিকে নজর দেয়া যাক। ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘাত বর্তমান সময়ের চলমান দীর্ঘতম। কিন্তু কেন, এবং কিভাবে এ সংঘাতের সূচনা। আজকের লেখাটি আমার নিজস্ব কোন গল্প নয়, এটা একটা ইতিহাস। যারা সকল মুসলিম দুর্ভাগ্যের আড়ালে ইহুদী বা খ্রিস্টান চক্রান্ত খুঁজে পেতে চান, এ লেখাটা তাদেরকে ঐতিহাসিক অর্থেই ভিন্ন আঙ্গিকে পথ দেখাতে সাহায্য করবে। আর যারা সত্যি সত্যি এ সংঘাতের উৎস জানতে চান, আশা করছি তারা এ দীর্ঘ সংঘাতের একটি ছোট্ট ইতিহাস জেনে যাবেন। সংঘাতের পুরোনো ‘ইতিহাস’ জানতে হলে আমাদেরকে দৃষ্টি ফেলতে হবে ধর্মগ্রন্থে। কারন প্রত্মতাত্তিকভাবে সমর্থিত হোক বা না হোক, ধর্মীয়ভাবে ইসরাইল (ইহুদী) আর ফিলিস্তিন (বর্তমানে মুসলিম) জাতি নিজেরা কী বিশ্বাস করে তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য নিয়ে, সেটা তাদের পবিত্র ভূমি নিয়ে কাড়াকাড়িতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ইসরাইলের ধর্মীয় ইতিহাস কি? হিব্রু বাইবেল এবং ইসলামী ধর্মীয় ইতিহাস মোতাবেক, নবী হযরত ইব্রাহিম (আ:) ঈশ্বর ইয়াহওয়েহ (হিব্রুতে ঈশ্বরকে এ নামেই ডাকা হয়ে থাকে, আর আরবীতে আল্লাহ) তাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে পবিত্র ভূমি কেনান তার সন্তানাদিকে দেয়া হবে (যেটা এখন ইসরাইল ফিলিস্তিন অঞ্চল)। আর্থাৎ তার বংশধররা এ এলাকার মালিক হবেন। হযরত ইব্রাহিম (আ:) এর প্রধান দুই পুত্র ইসমাইল (আ:) আর ইসহাক (আ:)। ভাগ্যক্রমে, ইসমাইল (আ:) ও তাঁর মা হাজেরাকে আরবের মক্কায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। আর ওদিকে কেনান দেশে রয়ে যান ইসহাক (আ:) [আইজ্যাক]। তার পুত্র ছিলেন ইয়াকুব (আ:) [জ্যাকব]। ইয়াকুব (আ:) আরেক নাম ছিলো ইসরাইল, তার বারো সন্তানের নামে ইসরাইলের বারো গোত্রের নাম হয়।

ঘটনাক্রমে ১২ পুত্রের একজন ইউসুফ (আ:) ভাইদের চক্রান্তে মিসরে উপনীত হন দাস হিসেবে। জেলের ভাত খেয়ে সাত বছর পর ভাগ্যের চাকা ঘুরে নিজেকে মিসরকর্তার ডান হতে হিসেবে আবিষ্কার করেন এবং একইসাথে তিনি হন নবী। দুর্ভিক্ষপীড়িত অন্য ভাইরা তাই কাছে তখন সাহায্য চাইতে ছুটে আসেন মিসরে। কালের পরিক্রমায় শত শত বছর বাদে এই ইসরাইলীরা মিসরের ফারাওয়ের দাসে পরিণত হয়, যখন এক মিসরীয় যুবরাজ (পালিত পুত্র) রাজপরিবারের সমস্ত আয়েশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বহু বছর বাদে ইসরাইলের নির্যাতিতদের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন, তিনি আর কেউ নন, নবী হযরত মূসা (আ:)। লোহিত সাগর পার করে তিনি ইসরাই জাতিকে নিয়ে যান ওপারে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্ত করে।

ইবী মূসা (আ:) পেলেন আসমানী কিতাব তাওরাত, কিন্তু তখন একেশ্বরবাদী ইহুদীরা পৌত্তলিকতায় মগ্ন হয়ে পড়ায় আল্লাহতা’লা তাদেরকে ৪০ বছর শাস্তি দেন। মরুর বুকেই তারা ঘুরপাক খেতে থাকে। অবশেষে নবী ইউশা (আ:) এর নেতৃত্বে তারা কেনান দেশে উপনীত হয়। এবার তাদের কেনান জয়ের পালা। এখানেই আমরা বুঝতে পারবো, কেনান দেশের আদি নাগরিক কারা ছিলো। তারা আর কেউ নয়, এখন আমরা যাদের ফিলিস্তিনি বলি, বলা চলে তারাই। তবে ফিলিস্তিনিরা এখানে আসে ইসরাইলীরা আসার কিছু আগে, খ্রিস্টপূর্ব ১২ শতকে। ফিলিস্তিনিরা মূলত অবমবধহ অরিজিনের। তারা এসেছিলো কাফতার থেকে। তার আগে এখানে ছিলো হিভাইট, জেবুসাইট, এমরাইট, হিট্টাইট, পেরিসাইট – এরা। তারা পৌত্তলিক ছিলো এবং বা’ল, আশেরা ইত্যাদি দেব-দেবীর পূজা করতো।

ইসরাইলীরা যখন কেনান দেশে থাকতো, তখন তারা স্থানীয়দের বিয়ে করে। ফলে পরবর্তী বংশধর এমনভাবে বাড়তে থাকে যে, ৮৭.৫%ই হলো কেনানীয় রক্ত। আর ফিলিস্তিনিরা নিজেদের কেনানীদের বংশধর বলেই জানে। তাই জিনগতভাবে তারা আসলে প্রায় একই। কেবল ধর্মবিশ্বাসে ছিলো আলাদা। ইসরাইলীরা যেখানে উপাসনা করতো এক ঈশ্বরের, সেখানে ফিলিস্তিনিরা ছিলো পৌত্তলিক। ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রথম রাজা হলেন তালুত, যাকে বাইবেলে বলে সল (Saul)। বেথেলহেমের জেসির ছোট ছেলে দাউদ (ডেভিড) তালুতের সেনাবাহিনী থেকে ফিলিস্তিনের জালুত/গোলায়াথ-কে পরাজিত করে একক যুদ্ধে এবং তখনই সকলের নজরে আসে। কালক্রমে তিনি ইসরাইলের জনপ্রিয় রাজা কিং ডেভিড/দাউদ হয়ে উঠেন [এবং ইসলাম মতে, নবীও)। তার পুত্র সলোমন বা সুলাইমান (আ:) তার রাজ্যকে আরো প্রসারিত করেন। তিনি  প্রতিষ্ঠা করেন টেম্পল অফ সলোমন বাইতুল মুকাদ্দাস। সুলাইমান (আ:) বা সলোমনের মারা যাবার পর পুত্র রেহোবামের রাজত্বকালে ইসরাইলের পতন শুরু হয়, পৌত্তলিকায় ডুবে যেতে থাকে। শক্তিমান ব্যাবিলন রাজ্যের আক্রমণে ইসরাইলীরা বন্দি হয়ে পড়ে। তাদের নির্বাসন শুরু হয়, আর ওদিকে ইসরাইল রাষ্ট্র ধুলায় মিশে যায়।

কিন্তু আল্লাহতা’লার চোখে শাস্তি শেষ হলে, খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৯ সময়কালে পারস্যের রাজা সাইরাস তাদের ব্যাবিলন থেকে মুক্ত করেন। এ সময় নবী হযরত দানিয়েল (আ:) এর কীর্তি উল্লেখযোগ্য। ফিরে এসে তারা পুনরায় বানায় ধ্বংসপ্রাপ্ত বাইতুল মুকাদ্দাস। আ রনবী/পাকব্যক্তি হযরত উজাইর (আ:) [এজরা] আর নেহেমিয়া (আ:) এর নেতৃত্বে ইসরাইল আবার ভালোর দিকে ফিরতে থাকে। তাছাড়া সাহায্য করেন হযরত হিজকীল (আ:) [এজেকিয়েল]। সুলাইমান পুত্র রেহোবামের সময় রাজ্যটি দুভাগ হয়েছিলো উত্তরের রাষ্ট্র ইসরাইল, আর দক্ষিনের রাষ্ট্র জুদাহ। এটা মোটামুটি খ্রিস্টপূর্ব ৯ম – ১০ম শতকের কথা। যখন খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ সালে অ্যালেক্সান্ডার দ্য গ্রেট মারা গেলেন, তখন তার জেনারেলরা কামড়াকামড়ি শুরু করে দেন রীতিমতো। যেমন- টলেমি নিয়ে নিলেন পুরো ইহুদী অঞ্চলের দখল। যদিও পরে সিরিয়ার সেলুচিদের হাতে খ্রিস্টপূর্ব ১৯৮ সালে হারিয়ে ফেলেন এ অঞ্চল। ওদিকে গ্রীক সভ্যতার সংস্পর্শে এসে ইহুদী ধর্ম প্রভাবিত হয়ে নতুন এক সেক্ট গড়ে ওঠে, যারা পরিচিত হয় হেলেনিস্টিক জ্যু (ইহুদী) নামে। তাদের মাঝে ছিলো গ্রীক সংস্কৃতির ছোঁয়া। মূল ধারার ইহুদীরা তাদের ধর্মচ্যুত মনে করতো।

খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ সালে রোমান জেনারেল পম্পেই জেরুজালেম দখল করে নেন। যীশুর জন্মের ৪৭ বছর আগে আলেকজান্দ্রিয়ার যুদ্ধে ৩,০০০ ইহুদী সেনা পাঠানো হয় যারা জুলিয়াস সিজার আর ক্লিওপেট্রাকে রক্ষা করে। রোমান সংসদ, হেরেদ নামে একজনকে ইহুদীদের রাজা হিসেবে নিয়োগ দেয়। এরকম সময়ে এই ইহুদী অঞ্চল যখন রোমান সাম্রারাজ্যের অধীনে, তখন জন্মগ্রহন করেন যীশু খ্রিস্ট [ঈসা (আ:)]।তিনি ছিলেন ‘মসীহ’ (অভিষিক্ত ত্রাতা), যিনি কি না এই হতভাগ্য ইহুদী রাষ্ট্রকে উদ্ধার করবেন, নতুন আলোর পথ দেখাবেন। কিন্তু যখন যীশু ইহুদী ইমামদের (র‌্যাবাইদের) দুর্নীতি নিয়ে কথা বলতে লাগলেন তখন ইহুদীরা চক্রান্ত করলো যেন রোমান শাসককে বুঝিয়ে যীশুকে ক্রুশে দিয়ে মেরে ফেলা যায়, এবং তা-ই তারা করলেন। ইহুদীর মতে, তারা যীশুকে ক্রুশে দিয়ে মেরে ফেলে। যদিও ইসলাম মতে, আল্লাহতা’লা হযরত ঈসা (আ:)কে অক্ষত রাখেন এবং তুলে নেন, যিনি শেষ সময়ে আবার ফিরে আসবেন। ৬৪ সালে ইহুদী নিয়ম জারি করা হয় যে, সকল ইহুদীকে ৬ বছর বয়স থেকেই লেখাপড়া শিখতে হবে। তখন থেকেই ইহুদীরা লেখাপড়াকে খুবই গুরুত্ব সহকারে নিত।

৬৬ সালে রোমান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীন রাষ্ট্র ইসরাইল ঘোষণা করে বসে ইহুদীরা। তখন তাদের শায়েস্তা করতে প্রায় ১ মিলিয় ইহুদীকে মারা হয়। ১৩১ সালে সম্রাট হাদ্রিয়ান ইহুদী ধর্ম নিষিদ্ধ করেন। জেরুজালেমের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘ইলিয়া কাপিতোলিনা’। বাইতুল মুকাদ্দাসের জায়গায় ‘জুপিটার মন্দির’ বসানো হয়। আর ইহুদী প্রদেশের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘পেলেস্টাইন’ বা আরবিতে ‘ফিলিস্তিন’। তখন আবারো বিদ্রোহ করে ইহুদীরা, কিন্তু কোন লাভ হয়নি। ৪র্থ শতকে সম্রাট কন্সটান্টিনোপল জাতীয় ধর্ম হিসেবে খ্রিস্ট ধর্ম ঘোষণা করার পর মরণাঘাত পায় ইহুদী ধম্য। মোটামুটি বড় নিষেধাজ্ঞা নেমে আসে ইহুদীদের উপর। ৬১১ সালের দিকে পারস্য সাম্ররাজ্যের অধীনে পড়ে ইহুদীরা। ওদিকে বাইজান্টিন সম্রাট হেরাক্লিয়াস/হারকিউলিস কথা দেন তিনি ইহুদী অধিকার ফিরিয়ে দেবেন, কিন্তু দেননি।

ইসলামী বিশ্বাস মতে, ৬১১ সালের এক রাতে হযরত মুহাম্মাদ (স:) মিরাজে জেরুজালেম গিয়েছিলেন, এবং সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত জেরুজালেমের বাইতুল মুকাদ্দাসের ওখানে নামাজ আদায় করেন। ৬৩৪-৩৬ সালে মুসলিম বাহিনী জেরুজালেম অধিকার করে নেয়। ক্রুসেডের আগ পর্যন্ত জেরুজালেম মুসলিম শাসকদের অধীনেই ছিলো। ৬৯১ সালে আব্দুল মালিক আজকের সেই সোনালি গম্বুজ নির্মাণ করেন। আর ৭০৫ সালে বানানো হয় মসজিদুল আকসা। ১০৯৯ সালে প্রথম ক্রুসেডে খ্রিস্টানরা জেরুজালেম দখল করে নেয়। কিন্তু ১১৮৭ সালে সুলতান সালাহুদ্দিন (সালাদিন) আইয়ুবি আবার দখল করে নেন জেরুজালেম। এ সময় পর্যন্তও ইহুদীরা ওখানেই থাকতো। কিন্তু ধীরে ধীরে ইউরোপে জায়গা করে নিতে থাকে তারা।

ইউরোপের ব্ল্যাক ডেথ মহামারির সময় ইহুদীদের অনেককেই খুন করা হয়, সন্দেহ ছিলো- তারা বুঝি কুয়ার পানিতে বিষ মেশাচ্ছে। আর স্পেনে খ্রিস্টান রাজত্বে মুসলিম আর ইহুদী দু’ধর্মের মানুষকেই মারা শুরু হয়ে যায়, যেটার নাম কুখ্যাত স্প্যানিশ ইনকুইজিশন। ততদিনে ১৪৯৭ সাল চলে এলো। ইহুদীরা পালিয়ে রোম, পোল্যান্ড, কিংবা উসমানী সাম্রারাজ্যে চলে গেলো। ১৫৩৮ সালে সুলতান সুলেমান জেরুজালেম ঘিরে বিখ্যাত দেয়াল তুলে দেন, যেটা এখন ওয়াল অফ জেরুজালেম নামে পরিচিত। এরপর কালের বিবর্তনে ১৯ শতকে ইহুদীরা ইউরোপে অধিকার পেতে শুরু করলো। তখন অর্ধেক ইহুদীই থাকতো রুশ রাজ্যে। এই রাশিয়ান ইহুদীরা ১৮৮৮২ সালে ‘হোভেভেই জিওন’ (জিওনের জন্যে ভালোবাসা) নামের আন্দোলন শুরু করে। জিওন বা জায়ন হলো জেরুজালেমের এক পাহাড়। মূলত জেরুজালেম ফিরে পাবার জন্যে এক আন্দেলন সূচনা সেটা, জায়োনিস্ট আন্দোলন। তারা মৃত হিব্রু ভাষা জীবিত করতে শুরু করলো।

১৯০২ সালের মাঝে ৩৫,০০০ ইহুদী তখন চলে আসে ফিলিস্তিনে, যেটা এখন ইসরাইল নামে পরিচিত। তখন সেটা অবশ্য অধিকারে ছিলো। এটাকে বলা হয়ে থাকে প্রথম আলিয়া, আলিয়া হলো ইহুদী পুনর্বাসন, যখন অনেক ইহুদী একসাথে চলে আসে। তখন মুসলিম প্রধান ফিলিস্তিনে দেখা গেলো, জেরুজালেমের জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই হঠাৎ করে ফিরে আসা ইহুদীতে পরিপূর্ণ।

১৮৯৬ সালে থিওডর হার্জল দ্য জুইশ স্টেট নামে এক লেখনিতে বলেন, ক্রমবর্ধমান ইহুদী বিদ্বেষের একমাত্র সমাধান আলাদা এক ইহুদী রাষ্ট্র। ১৮৯৭ সালে জায়োনিস্ট সংঘ গড়ে তোলা হয়। প্রথম জায়োনিস্ট কংগ্রেসে লক্ষ্য ধার্য করা হয়, প্যালেস্টাইনে ইহুদী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। ১৯১৪ সালের মাঝে দ্বিতীয় আলিয়া হয়ে গেলো, আরো ৪০,০০০ ইহুদী এ এলাকায় চলে এলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইহুদীরা সমর্থন দেয় জার্মানিকে, কারণ তারা শত্রু রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়ছিলো। খুবই আইরনিক, না? কারণ পরের বিশ্বযুদ্ধেই এই জার্মানিই, ইহুদীদের একদম নিশ্বিহ্ন করতে নেমে পড়েছিলো।

জায়োনিজম আন্দোলনকারীরা চাচ্ছিলো আমেরিকা আর ব্রিটেনের সমর্থন পেতে। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ ইতিমধ্যে সহানুভূতি দেখিয়েছিলেন। ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড বেলফোর ইহুদী কমিউনিটির নেতা রথসচাইল্ডকে চিঠি দেন, যা বেলফোর ডিক্লেরেশন নামে পরিচিত। এতে বলা হয়, ব্রিটিশ সরকারের এই ইহুদী রাষ্ট্রের ব্যাপারে সমর্থন আছে। ব্রিটিশ আর ফরাসী ব্যুরোক্রেটরা মিলে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সীমা নির্ধারণ করে। বিনিময়ে জায়োনিস্ট স্পাই নেটওয়ার্ক ব্রিটিশ সরকারকে ওসমানি সৈন্যসামন্ত নিয়ে তথ্য পাচার করতো।

বেলফোর ঘোষণার পরোক্ষ সমর্থন ১৯২২ সালে লিগ অফ ন্যাশনস দিয়ে দেয়। ১৯২৩ সালের মাঝে ৩য় আলিয়া হয়, এবং আরো ৪০,০০০ ইহুদী আসে ফিলিস্তিনে। আর ১৯২৯ সালের মাঝে ৪র্থ আলিয়া হয়, যখন আরো ৮২,০০০ ইহুদী চলে আসে। খরপাতিতে সাহায্য করতো জ্যুইশ ন্যাশনাল ফান্ড। বিদেশি জায়োনিস্টরাও এতে সাহায্য করতো। ১৯২৮ সালে JNC (Jewish National Council) গঠিত হয় ফিলিস্তিনে। ১৯২৯ সালে প্রথম বড় ইহুদী-মুসলিম দাঙ্গা হলো জেরুজালেমের ওয়েইলিং ওয়াল (বুরাক দেয়াল) নিয়ে। ফলে ১৯৩১সালে জায়োনিস্টরা ইর্গুন জাই লিউমি নামে এক মিলিশিয়া প্রতিষ্ঠা করে। এই ইহুদী সন্ত্রাসী সংগঠন ১৯৪৬ সালে জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেলে বোমা বিস্ফোরণ করে এবং ১৯৪৮ সালে ইহুদী অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে দেইর ইয়াসিন গ্রামে গণহত্যা সংঘটিত করে।

১৯৩৩ সালে নাৎসিদের সাথে চুক্তিতে আরো ৫০ হাজার ইহুদী ফিলিস্তিনে চলে আসে। ১৯৩৮ সালের মাঝে ৫ম আলিয়া হয়ে গেলো, প্রায় আড়াই লাখ ইহুদী এসে গেলো ফিলিস্তিনে। এরপর শুরু হয়ে গেলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, প্রায় ছয় মিলিয়ন ইহুদী হত্যা করে নাৎসিরা। মোটামুটি এই যুদ্ধ শেষ হবার মধ্য দিয়ে ইহুদীরা জায়োনিস্ট মুভমেন্টের মাথা হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৪৬ সালের জুলাইতে সন্ত্রাসী দল ইর্গুন কিং ডেভিড হোটেলে বিস্ফোরণ ঘটায়। সেখানে ফিলিস্তিনের ব্রিগেড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ হেডকোয়ার্টার ছিলো। সেই হামলায় মারা যায় ৯১জন মানুষ, আর আহত হয় ৪৬ জন। ইর্গুন সন্ত্রাসীরা আরবদেশীয় ওয়ার্কার আর ওয়েটার সেজে বোম পেতে আসে। বিস্ফোরণে পুরো দক্ষিণ পাশ ভেঙ্গে পড়ে। তখন তেলআবিব  (যেটা মূলত ইসরাইলের রাজধানী) শহরে কারফিউ জারি করা হয়। ফিলিস্তিনের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ইহুদীকে জেরা করা হয়।

 

১৯৪৭ সালের ১৫ই মে গঠিত হয় United Nations Special Committee on Palestine (UNSCOP) যা পরে প্রস্তাব দেয় “স্বাধীন এক আরব রাষ্ট্র, স্বাধীন এক ইহুদী রাষ্ট্র এবং জেরুজালেম শহর”- এই তিন ভাগ। সামান্য কিছু এদিক – ওদিকের মাধ্যমে জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলীতে এই প্রস্তাব বিষয়ে ভোটা-ভুটি হয়। ফলস্বরুপ ইহুদী সমাজে উচ্ছ্বাস আর আরব সমাজে অসন্তুষ্টি ছড়িয়ে পড়ে। ঐ অঞ্চলে দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। প্রায় ১ লাখ আরব ইহুদীপ্রধান এলাকা থেকে বিতাড়িত হয়। আমেরিকা তখন ফিলিস্তিন ভাগ করার প্রস্তাব থেকে সমর্থন গুটিয়ে নেয়, কিন্তু ৭ই ফেব্রুয়ারী ১৯৪৮ তারিখে ব্রিটেন নতুন সমর্থন ব্যক্ত করে। জায়োনিস্ট নেতা ডেভিড বেনগুরিওন সকল ইহুদীর জন্যে নারী-পুরুষের সামরিক প্রশিক্ষন বাধ্যতামূলক করে দেন। অবশেষে ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে, শেষ ব্রিটিশ সামন্ত এলাকা ছেড়ে চলে যায়। সেদিন তেলআবিব মিউজিয়ামে জ্যুইশ পিপলস কাউন্সিল সমবেত হয় এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ঘোষণা করে। সাথে সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান এবং সোভিয়েতের স্ট্যালিন ঘোষিত ইসরাইলকে স্বীকৃতি প্রদান করে। তবে আরব লিগের মিসর, জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন, ইরাক তা প্রত্যাখ্যান করে।

আরব রাষ্ট্রগুলো তখন ফিলিস্তিনের দিকে এগিয়ে যায় এবং শুরু হয় প্রথম আরব-ইসরাইল যুদ্ধ। আরব রাষ্ট্রগুলো তখন ফিলিস্তিনের দিকে এগিয়ে যায় এবং শুরু হয় প্রথম আরব-ইসরাইল যুদ্ধ। আরব রাষ্ট্রগুলো আক্রমণ করে, কিন্তু সদ্যোজাত ইসরাইলের তখনও কোনর ভারি অস্ত্র ছিলো না। তখন জাতিসংঘ অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করে এ অঞ্চলে ইসরাইলকে রক্ষা করতে। কিন্তু চেকোস্লোভাকিয়া সেই নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে ইসরাইলকে অস্ত্র সরবরাহ করে। ১১ই জুন এক মাসের শান্তিচুক্তিতে বাধ্য করে জাতিসংঘ। এই যুদ্ধে ইসরাইলের মোট জনসংখ্যা সাড়ে ছয় এর মধ্যে ৬,০০০ মানুষ মারা যায়। ৭ লাখ ২৬ হাজার ফিলিস্তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। ১৯৪৯ সালের ১১ই মে ইসরাইল জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত হয় এবং দেশটিকে সদস্যপদ প্রদান করা হয়।

ইসরাইলের সংসদ ‘নেসেত’ (Knesset) প্রথম মিলিত হয় তেলআবিবে। এরপর ১৯৪৯ সালের সিজফায়ারের পর থেকে চলে যায় জেরুজালেমে। ডেভিড বেনগুরিওন জানুয়ারীতে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে ইসরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহন করেন। ইমিগ্রেশনের কারণে ১৯৫১ সালের মধ্যেই দেশটির জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং ১৯৫৮ সালে জনসংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় বিশ লাখে। এ সময়টাতে দুর্ধর্ষ ইসরায়েলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের তৎপরতা ওঠে তুঙ্গে। তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদী হত্যাকারী নাৎসীদের খুঁজে বের করে হত্যা করতে থাকে, বা মৃত্যুদন্ড দিতে থাকে। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খালজনিত জটিলতায় ইসরাইল মিসর আক্রমণ করে বসে। ইসরাইলের মিত্র ছিলো ব্রিটেন ও ফ্রান্স। বিশ্বে প্রবল নিন্দার ঝড় ওঠে। ১৯৬৮ সালের মার্চে ইসরাইলি বাহিনী আক্রমণ করে ফিলিস্তিনি বাহিনী ফাতাহকে। তবে ফাতাহ আর পিএলও (Palestine Liberation Organisation) তখন আরব জুড়ে নাম করে ফেলে। ১৯৬৯-৭০ সালে আবারও মিসরের সাথে ইসরাইলের যুদ্ধ লেগে যায়। ১৯৬৯ এর ডিসেম্বরে মিসরকে সাহায্য করেছিলো এমন ৫জন সোভিয়েত সেনাকে, ইসরাইল এর নেভি মেরে ফেলে। ইসরায়েলের জন্যে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে গেলে, তা ঠান্ডা করতে আমেরিকা কাজ করতে থাকে। ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে উভয় পক্ষ সিজফায়ারে রাজী হয়। তখন মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসের।

১৯৭২ সালে মিউনিখ অলিম্পিকের সময় ইসরাইল সকার দলের ১১জন খেলোয়ারকে ফিলিস্তিনি Black September Organisation (BSO)জিম্মি করে। জার্মান তৎপরতায় আটজন কিডন্যাপারের পাঁচজনই মারা যায়, আর সাথে সকল খেলোয়াড়বৃন্দ। পরবর্তীতে এক হাইজ্যাক হওয়া বিমানের হোস্টেজদের মুক্ত করতে জার্মান সরকার এই গ্রেফতারকৃত ফিলিস্তিনিদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। ইসরাইল সরকার এর জবাবে বোমা বিস্ফোরণ, গুপ্তহত্যা আর লেবাননে পিএলও সদর দপ্তরে হামলা করে। হামলার নেতৃত্ব দেন এহুদ বারাক, যিনি পরে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন।

১৯৭২ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট হয়ে এলেন আনোয়ার সাদাত। এরপর ইয়ম কিপুর যুদ্ধে মিসর আর সিরিয়া মিলে অকস্মাৎ ইসরাইলের ওপর আক্রমণ করে বসেন। তবে মিত্রের পূর্ণ সহযোগিতায় ইসরাইল ভালোভাবেই যুদ্ধে নেমে যায়। এ যুদ্ধের ফলে সৌদি সরকার ১৯৭৩ এর তেল সংকটের সূচনা করে। ১৯৭৪ সালে পিএলও জাতিসংঘে অবজার্ভার স্ট্যাটাস পায়, আর পিএলও প্রধান ইয়াসির আরাফাত জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলিতে ভাষণ দেন। ১৯৭৪ এর শেষ দিকে ইসহাক রাবিন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৭৭ সালে রাবিন এক কেলেংকারিতে সরে দাঁড়ান শিমন পেরেজ প্রধানমন্ত্রী হন। তবে পরবর্তী নির্বাচনে জিতে মেনাখেম বেগিন প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান। ৩০ বছরের শত্রুতা ঝেড়ে মিসরের তৎকালিন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত জেরুজালেম ভ্রমণে যান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার সাদাত আর বেগিনের সাথে মিলিত হয়ে ক্যাম ডেভিডে এক শান্তিচুক্তির রুপরেখা অংকন শুরু করেন। পশ্চিম তীর আর গাজা এলাকা ফিলিস্তিনের অধিকারে থাকবে। ওদিকে ১৯৭৯ সালে ইরানি ইসলামি বিপ্লব থেকে পালিয়ে আসে ৪০ হাজার ইহুদী। ১৯৮৪ সালে ইথিওপিয়াতে দুর্ভিক্ষ চলাকালে ৮,০০০০ ইথিপিয়ান ইহুদীকে উড়িয়ে নিয়ে আসা হয় ইসরাইলে। ১৯৮৫ সালে লেবানন থেকে সব ইসরাইলী সামন্ত সরিয়ে নেয়া হয়। ১৯৯২ সালে আবারো জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রীত্বে ফিরে আসেন ইসহাক রাবিন।

 

লেবাননের শিয়া হিজবুল্লাহ পার্টিকে দুর্বল করার উদ্দেশ্য নিয়ে ইসরাই এক সপ্তাহ ধরে লাগাতার হামলা চালায়। ১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারীতে ইসরাইলের মৌলবাদী ইহুদী কাখ পার্টির সমর্থক বারুখ গোল্ডস্টাইন হেব্রনের পবিত্র প্যাট্রিয়ার্ক গুহাতে (কথিত আছে যে এই গুহায় নবী হযরত ইব্রাহিম আ: এর কবর আছে) ২৯ জন ফিলিস্তিনিরক হত্যা করে, আহত করে ১২৫ জনকে। ১৯৯৪ সালে ওয়াশিংটন ডিক্লারেশনে স্বাক্ষর করে জর্ডান আর ইসরাইল, সাক্ষী ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন। ফলে, দীর্ঘদিনের এক যুদ্ধ পরিস্থিতি শেষ হয়, যেটা দুই দেশের মাঝে ছিলো। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি সুন্নি সংগঠন হামাস এর তীব্র বিরোধিতা স্বত্বেও পিএলও চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাত ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী ইসহাক রাবিন এর সাথে এক শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন [অসলো অ্যাকর্ড]। ২০০১ সালে এরিয়েল শ্যারন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন এবং ২০০২ সালে পশ্চিম তীরে ব্যারিয়ার বানানো শুরু করলেন। এর প্রতিবাদে ফিলিস্তিনের গাজা থেকে সেখানে মর্টার হামলা হতে থাকে। আর লেবানন থেকে হিজবুল্লাহ’র আক্রমন অব্যাহত ছিলো। ২০০৪ সাল থেকে একদম পুরোদমে গাজায় প্রতিশোধ নিতে নামে ইসরাইল। চলতে থাকে অপারেশন।

২০০৬ সালের ফিলিস্তিন নির্বাচনে হামাস জয়লাভ করে। ক্ষমতা নিয়েই হামাস আগের ইসরাইলের সাথে স্বাক্ষর করা সকল চুক্তি বাতিল বলে গণ্য করে। এমনকি ইসরাইল এর প্রতি প্রচন্ড ঘৃণা থেকে তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদী গণহত্যাকে জায়োনিস্টদের বানানো মিথ বলেও প্রচার করতে থাকে। এই সালের ১৪ই মার্চ এক ফিলিস্তিনি জেলে অপারেশন চালায় ইসরাইল। জুন মাসে ফিলিস্তিনের হামাস গাজা সীমান্ত অতিক্রম করে ইসরাইলী সেনাকে ধরে নিয়ে আসে। লেবাননের হিজবুল্লাহও প্রায় একই কাজ করে দুজন ইসরাইলী সেনা আটক করে নিয়ে আসে। ফলে ইসরাইল লেবানন দ্বিতীয় যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ২০০৭ সালে গাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় হামাস। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরাইলী বিমান বাহিনী সিরিয়ার নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর ধ্বংস করে দেয় এবং ২০০৮ সালে হামাসকে নাস্তা নাবুদ করতে গাজায় অভিযান চালায়। ২০০৯ সালে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসেন বিনইয়ামিন নেতানিয়াহু এবং এখনো তিনি আছেন।  ২০১১ সালে হামাস আর ইসরাইলের চুক্তি হয়, যার ফলে সেই অপহরণ করা ইসরাইলী সেনার বিনিময়ে ইসরাইল ১০২৭ জন ফিলিস্তিনি বন্দিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। ২০১২ সালের নভেম্বরে হামাস নেতা আহমেদ জাবারিকে হত্যা করতে ইসরাইল গাজায় হামলা চালায়। ২০১৪ সালে ফাতাহ আর হামাস একত্রে সরকার গঠন করার সমাঝোতা করলো, তখন ইসরাইল শান্তিচুক্তি করতে বসতে অস্বীকৃতি জানায়। ২০১৪ সালে এসেও ইসরাইল -ফিলিস্তিন দ্বৈরথ চলছেই।

যা-ই হোক, ২০০৫ এর হিসাব মতে, জেরুজালেমে ৭,১৯,০০০ মানুষ বাস করতো, যার ৪,৬৫,০০০ ইহুদী আর ২,৩২,০০০ মুসলিম। ইহুদীরা পশ্চিমে, আর মুসলিমরা পূর্ব দিকে বাস করে। জেরুজালেম খ্রিস্টান, ইহুদী আর মুসলিম এই তিন ধর্মাবলম্বীদেরই তীর্থস্থান। এই পবিত্র ভূমি নিয়ে মারামারির পেছনে কারণ সেই একটাই – কারা এর আসল মালিক?

সুত্র: দ্য জুইশ স্টেট- বাই থিওডর হার্জল এবং আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ এর ইহুদী জাতির ইতিহাস। ২৮শে অক্টোবর ২০২৩

 

Read More

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ পোস্ট

Advertising