সুপ্রভাত সিডনি প্রতিবেদন: ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ফ্যাসিবাদ
জনগণের তীব্র গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট দেশ থেকে তড়িঘড়ি করে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন সাবেক স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে যে ফ্যাসিবাদী ও নির্মম শাসনকাঠামো তিনি দাঁড় করিয়েছিলেন, তার পতন ঘটেছে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ছাত্র-জনতার স্রোতে। বর্তমানে তিনি ভারতে এক প্রকার নজরবন্দী ও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন (আইসোলেটেড) অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের নির্মম বাস্তবতা আড়াল করতে এবং পলাতক স্বৈরাচারকে টিকিয়ে রাখতে এখন শরণ নেওয়া হচ্ছে সাইবার দুনিয়ার। একদিকে দিল্লির কঠোর প্রোটোকলে শেখ হাসিনার বন্দিজীবন, অন্যদিকে ইউরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিচালিত নিষিদ্ধ আওয়ামী সাইবার টিমের ভুয়া প্রোপাগান্ডা—সব মিলিয়ে আওয়ামী রাজনীতির বর্তমান রূপটি এখন কেবলই এক বিভ্রান্তিকর গোলকধাঁধা।
১. দিল্লির কঠোর প্রোটোকল: নজরবন্দী ও বিচ্ছিন্ন শেখ হাসিনা
বাস্তবতা হলো, ভারত সরকার তাদের কূটনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিলেও তার ওপর আরোপ করেছে কঠোর বিধিনিষেধ।
- মিডিয়া ও জনসম্মুখে নিষেধাজ্ঞা: ভারত সরকারের কঠোর সতর্কতার কারণে তিনি ভারতীয় কিংবা বাংলাদেশী কোনো সংবাদমাধ্যমের সামনে উপস্থিত হতে পারছেন না।
- নেতাকর্মীদের হতাশা: দেশ-বিদেশ থেকে তার অন্ধ ভক্ত ও দলীয় নেতাকর্মীরা দিল্লিতে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য ছুটে গেলেও কঠোর প্রটোকলের কারণে কাউকেই সাক্ষাৎ দেওয়া হচ্ছে না। ফলে বিষণ্ণ ও নিরাশ মনে ফিরে যাচ্ছেন তারা।
- কূটনৈতিক নীরবতা: আন্তর্জাতিক চাপ এবং বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ ঠিক রাখতে ভারতকে এই কৃত্রিম নীরবতা বজায় রাখতে হচ্ছে, যা শেখ হাসিনাকে কার্যত এক রাজনৈতিক বন্দিতে পরিণত করেছে।
২. সাইবার যুদ্ধ ও এআই বুস্টিং: ভুয়া আশার আফিম
মাঠের রাজনীতিতে সম্পূর্ণ পরাস্ত হয়ে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ সাইবার উইং এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে বেছে নিয়েছে। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার ফেক (ভুয়া) আইডি খুলে শেখ হাসিনার নামে নানাবিধ মুখরোচক ও কাল্পনিক বক্তব্য পোস্ট করা হচ্ছে।
[আওয়ামী সাইবার প্রোপাগান্ডা মডেল]
ফেক আইডি সৃষ্টি, AI চালিত ফটো ও স্টিকার তৈরি, পেইড অটো বুস্টিং, দুর্বলচিত্ত কর্মীদের বিভ্রান্তি : ফ্যাক্ট চেক বা তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করেছে যে, এই সমস্ত অডিও বার্তা, বিবৃতি বা উক্তিগুলোর কোনোটিরই বাস্তব ভিত্তি নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং অটো বুস্টিং প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি এই ডক্টরেড কনটেন্টগুলো কেবলই আতঙ্কিত ও দিশেহারা আওয়ামী সন্ত্রাসীদের চাঙ্গা রাখার একটি ব্যর্থ চেষ্টা। এর মাধ্যমে সাধারণ ও দুর্বলচিত্ত মানুষের মনে সাময়িক কিছু ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করা হলেও, সচেতন সমাজ তা শুরুতেই প্রত্যাখ্যান করেছে।
৩. ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম: স্বৈরশাসকদের আর ফেরা হয় না
রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া কেবল বন্দুকের নলে ভর করে টিকে থাকা কোনো ফ্যাসিস্ট সরকার যখন একবার পালিয়ে যায়, তখন তারা আর কখনোই রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফিরতে পারে না। ইতিহাসে এর অসংখ্য নজির রয়েছে:
ঐতিহাসিক উদাহরণ
- ইদি আমিন (উগান্ডা): উগান্ডার এই কুখ্যাত স্বৈরশাসক ১৯৭৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে লিবিয়া হয়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নেন। আমৃত্যু নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ২০০৩ সালে জেদ্দায় তার মৃত্যু হয়; তিনি আর কখনো ক্ষমতায় ফিরতে পারেননি।
- ফার্দিনান্দ মার্কোস (ফিলিপাইন): ১৯৮৬ সালে ফিলিপাইনের ‘পিপল পাওয়ার রেভল্যুশন’-এর মুখে দেশ ছেড়ে হাওয়াই দ্বীপে পালিয়ে যান মার্কোস। নির্বাসিত অবস্থাতেই ১৯৮৯ সালে তার মৃত্যু হয়।
ইতিহাস স্পষ্ট সাক্ষ্য দেয়—দেশ ছেড়ে পালানো স্বৈরশাসকদের পুনরাগমন অত্যন্ত বিরল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অসম্ভব। তারা নির্বাসনেই নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে বাধ্য হন।
৪. শেখ হাসিনার শাসনামলের নির্মম অধ্যায়: যে অপরাধগুলোর বিচার অবধারিত
শেখ হাসিনা মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ালেও তার দীর্ঘ শাসনামল ছিল রক্তক্ষয়ী, নির্মম এবং লুটপাটের কালো ইতিহাসে ঘেরা। দেশপ্রেমিক ও মানবাধিকারকামী জনগণের দাবি—ডিসেম্বর বা কোনো সুদূর ভবিষ্যৎ নয়, সাহস থাকলে তিনি এখনই দেশে ফিরুন এবং প্রচলিত আদালতের মুখোমুখি হন। তার বিরুদ্ধে আনীত প্রধান প্রধান অপরাধের খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো:
অপরাধের খাত : সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও নৃশংসতা
গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন : ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হাজারো তরুণ ও শিশুকে হত্যা এবং হাজার হাজার মানুষকে পঙ্গু করা।
গুম ও আয়নাঘর সংস্কৃতি: বিরোধী রাজনৈতিক দল ও ভিন্নমতাবলম্বীদের তুলে নিয়ে বছরের পর বছর ‘আয়নাঘর’ নামক গোপন টর্চার সেলে আটকে রাখা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।
পিলখানা হত্যাকাণ্ড: ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের নামে পিলখানায় ৫৭ জন বীর ও দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে দেশের প্রতিরক্ষা কাঠামো দুর্বল করা।
হলি আর্টিজান ট্র্যাজেডি: গুলশানের হলি আর্টিজানে সুপরিকল্পিতভাবে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের দাওয়াত দিয়ে এনে জিম্মি ও জবাই করে হত্যার পেছনে রাষ্ট্রের রহস্যজনক ভূমিকা, যা বিদেশী বিনিয়োগ ধ্বংসের কারণ ছিল।
ধর্মীয় নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ড : বশংবদ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মাধ্যমে বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ড। জুম্মার নামাজের সময় রহস্যজনক এয়ারকন্ডিশন (AC) বিস্ফোরণে শত শত মুসল্লির মৃত্যু এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত।
আর্থিক খাতের ডাকাতি: বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, বিভিন্ন বেসরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া ও ফাঁকা করে দেওয়া।
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড :সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিকে নৃশংসভাবে হত্যা এবং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এর তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দিয়ে সত্য ধামাচাপা দেওয়া। অগণিত জুলুম, অত্যাচার ও দুর্নীতির দীর্ঘ তালিকা থেকে মাত্র অল্প কিছু উদাহরণ এখানে তুলে ধরা হলো।
দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী এই সমস্ত অপরাধের শাস্তি একমাত্র মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসি। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, তিনি হয়তো ভাবছেন দেশে ফিরে বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়ে তার অনুগত রাষ্ট্রপতি ‘চুপ্পু’র (মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন) কাছে ‘মার্সি পিটিশন’ বা প্রাণভিক্ষার আবেদন করবেন এবং রাষ্ট্রপতি তা মওকুফ করে আরেকটি কলঙ্কজনক রেকর্ড গড়বেন। কিন্তু জাগ্রত জনতার আদালতে এই নীলনকশা বাস্তবায়ন অসম্ভব।
৫. “দেশে ফিরবো” ঘোষণার অন্তরালে রাজনৈতিক রহস্য
শেখ হাসিনা ও তার দলের পক্ষ থেকে বারবার যে দেশে ফেরার কাল্পনিক দাবি ও রাজনৈতিক বুলি আওড়ানো হচ্ছে, তার পেছনে গভীর কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে। অভিজ্ঞ মহলের মতে, এই ভুয়া বুলির পেছনে ৫টি মূল কারণ কাজ করছে:
১. সমর্থকদের মনোবল ধরে রাখা: তৃণমূলের কর্মীরা যেন সম্পূর্ণ ভেঙে না পড়ে এবং দলটির অস্তিত্ব যেন একদম বিলীন না হয়, সে জন্য নেতৃত্ব এখনও সক্রিয় ও ফিরে আসার ইচ্ছা রাখে—এমন একটি মিথ্যা আশ্বাস টিকিয়ে রাখা।
২. রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখা: নিজেকে রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে মাইনাস হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে এবং ‘আমি এখনও প্রাসঙ্গিক’—এই বার্তা দিতেই এই ফাঁকা আওয়াজ।
৩. আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা: নিয়মিত বিরতিতে বিতর্কিত বক্তব্য বা অডিও ক্লিপ ছেড়ে মিডিয়া এবং জনমতের ফোকাসে থাকার একটি সস্তা কৌশল এটি।
৪. আন্তর্জাতিক মহলে কার্ড খেলা: বিদেশী বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বা সরকারের কাছে নিজের রাজনৈতিক দরকষাকষির সক্ষমতা জাহির করা।
৫. ভবিষ্যতের বিকল্প পথ খোলা রাখা: যদি কোনো কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বা আইনি পরিস্থিতি টালমাটাল হয়, তবে সেই সুযোগে দেশে ফেরার একটি সুদূরপ্রসারী পথ তৈরি করে রাখা।
৬. দিল্লির সম্ভাব্য সমাধান: শেখ হাসিনা কি জীবিত নাকি নিখোঁজ?
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় কিছু অসমর্থিত মিডিয়া এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সূত্রে একটি চাঞ্চল্যকর দাবি সামনে এসেছে। গুঞ্জন উঠেছে, শেখ হাসিনা হয়তো বেশ কয়েক মাস আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন কিংবা তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অভিজ্ঞ মহলের বিশ্লেষণ: বিগত ১৬-১৭ বছর ধরে বাংলাদেশে যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, পিলখানা হত্যাকাণ্ড এবং সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়ার নরকীয় তাণ্ডব চালানো হয়েছে, তার প্রধান রাজসাক্ষী স্বয়ং শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে নিজের পিঠ বাঁচাতে ভারতকে হয়তো একসময় এই প্রমাণের শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলতে হতে পারে। শেখ হাসিনাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিলেই এই সমস্ত অপরাধের অকাট্য প্রমাণাদি আড়াল করা ভারতের জন্য সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ সমাধান বলে মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। যেহেতু বাংলাদেশের মাটিতে এই মুহূর্তে তার মৃতদেহ দাবি করার মতো কেউ নেই, তাই লাশ পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়াও অসম্ভব কিছু নয়।
শেষ কথা : নেশার ঘোর কেটে বাস্তবতার সূর্যোদয়
সব কিছুরই একটা শেষ থাকে। ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে গেছে এবং তা চিরতরের জন্যই ঘটেছে। অথচ এখনও কিছু অবুঝ, বিভ্রান্ত ও অন্ধ নেতাকর্মী ‘ডিসেম্বরে আফা আসবে’ কিংবা ‘হাসিনা ফিরবে’ দেওয়াল লিখন ও স্লোগান দিয়ে দিবা স্বপ্ন দেখছেন।
তৃণমূলের এই নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলা প্রয়োজন : প্রোপাগান্ডার এই নেশার ঘোর থেকে বেরিয়ে আসুন এবং কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হোন। ফাঁকা স্লোগান আর এআই প্রযুক্তির ভুয়ো আশ্বাস আপনাদের কোনো আইনি বা রাজনৈতিক সুরক্ষা দেবে না। ম্যানিলা রশির বস্তা মাথায় নিয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনা আর কখনোই বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে আসতে পারবেন না; ফেরার সব রাস্তাই বন্ধ হয়ে গেছে। অতএব, জনগণের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে অতীত পাপের খতিয়ান মাথায় নিয়ে নতুন করে সত্য ও ন্যায়ের রাজনীতিতে ফিরে আসার চেষ্টা করা হবে আপনাদের জন্য একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ- যদি বাংলার জনগণ ক্ষমা করে !