
আব্দুল্লাহ ইউসুফ শামীম (সুপ্রভাত সিডনি): একজন ক্ষণজন্মা, প্রতিযশা কবি, লেখক, সাহিত্যিক ও বিশিষ্ট সংগঠক সকলকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন। এই প্রস্ফুটিত গোলাপের আকস্মিক প্রস্থানে যশোরবাসী যেন অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর। তাঁর স্মরণে প্রকাশিত চমৎকার প্রচ্ছদের ৬৪ পৃষ্ঠার স্মরণিকাটি সকলের মনে দাগ কেটেছে। তিনি কয়েক হাজার প্রতিবাদী কবিতা ও কয়েকশ প্রবন্ধ লিখেছেন, যা এখনো প্রকাশের অপেক্ষায়।
স্মরণিকার ৫৭ পৃষ্ঠায় গিয়ে চোখ আটকে গেল। মরহুমার প্রথম ছেলে মোস্তানুর রহমান স্বাক্ষরের আবেগজড়িত লেখাটি পড়ার পর মনকে আর মানাতে পারলাম না। দু-লাইন লিখতে বসলাম, কিন্তু পারছি না! কী লিখব? হাত কাঁপছে। এই তো সেদিন দেখা হলো। বিদ্রোহী সাহিত্য পরিষদের এক অনাড়ম্বর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল মুন্না ভাইর মাধ্যমে । প্রচণ্ড মিশুক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন, অল্প সময়েই আপন করে নিয়েছিলেন। তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম; নিজ হাতে হরেক পদের খাবার রান্না করে, অত্যন্ত যত্ন সহকারে প্লেটে তুলে দিয়ে আমাদের আপ্যায়ন করেছিলেন। বিদায়বেলায় মধ্যরাত পর্যন্ত বাস স্টপেজে আমাদের সাথে বসে রইলেন। অনেক বুঝিয়েও তাঁকে বাসায় পাঠানো গেল না; বাস না ছাড়া পর্যন্ত তিনি বসে রইলেন । তাঁর স্মৃতি নিয়ে অনেক কবি ও সাহিত্যিক লিখেছেন, তাঁদের সকলকে ‘সুপ্রভাত সিডনি’র পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভকামনা জানাচ্ছি। মরহুমাকে নিয়ে এই অল্প পরিসরে বিস্তারিত লেখা সম্ভব নয়, তবে এতটুকু না বললেই নয়, তিনি যশোরের সাহিত্যপ্রেমীদের হৃদয়ে গেঁথে থাকা এক যোদ্ধা, যাঁর বিশেষণের কোনো মৃত্যু নেই।
তাঁর পরিচয় নতুন করে দেওয়ার কিছু নেই, তবুও সংক্ষেপে তুলে ধরছি: নূরজাহান আরা নীতি ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দের ১লা আগস্ট নড়াইল (বর্তমান জেলা) শহরের ডুমুরতলার ঐতিহ্যবাহী মোল্যা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা বাম আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী নওরোজ মোল্যা এবং মাতা জামিলা মমতাজ ছিলেন হাজার কৃষকের নেত্রী।
তিনি ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। শিক্ষাজীবনে নড়াইল সরকারি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, নড়াইল সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি, যশোর সরকারি এমএম কলেজ থেকে স্নাতক (ডিগ্রি) এবং যশোর শহীদ মশিয়ূর রহমান আইন মহাবিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাস করেন। তিনি যশোর জজ কোর্টে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
এসএসসি পাস করার আগেই মাতৃবিয়োগ ঘটায় ছোট পাঁচ ভাই-বোনকে নিয়ে তাঁর সংসারের মূল যাত্রা শুরু হয়। পিতামহ ও পিতামহীর সহযোগিতায় নিজের পড়াশোনা এবং ভাই-বোনদের বড় করে তোলার পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন ধরে রেখেছিলেন।
তেভাগা আন্দোলনের প্রাণপুরুষ, তাঁর পিতামহ নূর জালাল মোল্যার আদর্শ ধারণ করে তিনি ছুটে বেড়াতেন গ্রাম থেকে গ্রামাঞ্চলে। যেখানেই অন্যায়, সেখানেই প্রতিবাদ করার মানসিকতা পোষণ করতেন। তাই তো তিনি সবসময় বিভিন্ন প্রতিবাদ সমাবেশ, মিছিল ও গণসংযোগে শামিল হয়ে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতেন।
তাঁর স্বামী যশোরের মণিরামপুরের বাসিন্দা সাংবাদিক, লেখক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক গোলাম মোস্তফা মুন্না। অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত কমাত্র বাংলা পত্রিকা সুপ্রভাত সিডনির সাথে দীর্ঘদিন কাজ করছেন।
তিনি দুই পুত্রের জননী, বড় ছেলে স্বাক্ষর (২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলপ্রার্থী) এবং ছোট ছেলে অক্ষর (যশোর জিলা স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র)।
২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর ভোর আনুমানিক তিনটার দিকে যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঘুমের মধ্যেই তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আল্লাহপাক মরহুমকে জান্নাতুল ফেরদৌস দেন করুন ( আমিন)
নীতির কথা এবং… স্মরণিকা ২০২৫’ প্রকাশে যাঁরা লেখা দিয়ে এবং বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের সকলকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।