
শিমুল চৌধুরী: একটি জাতির ইতিহাসে স্বাধীনতা কিংবা গণঅভ্যুত্থানের মতো বড় অর্জন কখনো কোনো বিদেশি শক্তির হাত ধরে কিংবা তাদের অনুকম্পায় পূর্ণতা পেতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষী, কোনো জাতি যখন তার নিজস্ব স্বাধিকার ও মুক্তির লড়াইয়ে অন্য কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই অর্জন কেবল কলঙ্কিতই হয় না —পরবর্তীতে তা অন্য রাষ্ট্রের হাতে শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
আজ ৫ আগস্ট। ২০২৪ সালের এই দিনে রক্তক্ষয়ী এক সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে টানা ষোলো বছরের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটেছিল। আজ থেকে ঠিক পাঁচ দশক আগে ১৯৭১ সালে এ দেশের জনগণ পিনাকপ্রতিম আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জন করেছিল স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু ইতিহাস আমাদের সামনে বারবার সেই একই কঠিন প্রশ্ন এনে দাঁড় করায় — আমরা কি আমাদের এতো ত্যাগের বিনিময়ে অর্জন করা স্বাধীনতাকে নিজস্ব সার্বভৌমত্বের ওপর দাঁড় করাতে পেরেছি, নাকি বারবার এক প্রভূর হাত থেকে আরেক প্রভূর বলয়ে বন্দি হচ্ছি?
১৯৭১ সালে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। এ যুদ্ধের মূল কারিগর ছিল এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও সাধারণ জনগণ। কিন্তু সমকালীন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রত্যক্ষ সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তাকে তৎকালীন নেতৃত্ব এতটাই পরম সত্য বলে ধরে নিয়েছিল যে, স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতের এক শ্রেণির নীতি-নির্ধারক বাংলাদেশকে তাদের ‘ত্রিশতম অঙ্গরাজ্য’ বা অনুগত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে।
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর এসে দেখা গেল, এ দেশের মানুষের ভোটের অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বহুলাংশে এক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অঘোষিত নিয়ন্ত্রণের অধীন হয়ে পড়েছিল। তাহলে প্রশ্ন জাগে, ১৯৭১ সালে কেন ত্রিশ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছিল? নিশ্চিতভাবেই কোনো বিদেশি শক্তির অনুগত রাষ্ট্র হওয়ার জন্য নয়।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ঘটে যাওয়া গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। দেড় হাজারেরও বেশি তরুণ ও সাধারণ মানুষের প্রাণ এবং হাজার হাজার মানুষের পঙ্গুত্ব বরণের বিনিময়ে অর্জিত এই ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বা পুনর্জন্ম এ দেশের মানুষকে আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে।
তবে এ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এবং শেখ হাসিনার পতন-পরবর্তী কূটনৈতিক সমীকরণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের উপস্থিতি নিয়ে নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মনে স্পষ্ট কিছু প্রশ্ন ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনার বহুল আলোচিত দাবি, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেন্ট মার্টিনে সামরিক ঘাঁটি করতে চায়”। শেখ হাসিনার এ দাবি আজকের পরিবর্তিত বাস্তবতায় অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষককেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
জুলাই-উত্তর বাংলাদেশে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কূটনৈতিক বার্তা, অর্থনৈতিক সহায়তার আশ্বাস এবং সুশীল সমাজের একটি অংশের অতি-উৎসুক পশ্চিমাঘেঁষা নীতি দেখে প্রশ্ন উঠছে: তবে কি ১৯৭১ সালে ভারত-নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশের যে ঐতিহাসিক ক্ষতি হয়েছিল, ২০২৪-এর পর আমরা কি একই কায়দায় মার্কিন বা পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণ বলয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছি?
যদি ১৯৭১ সালের ভারত-নির্ভরতার মাশুল হিসেবে আমাদের ষোলো বছরের একনায়কতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের সংকট সহ্য করতে হয়ে থাকে, তবে ২০২৪-পরবর্তী সময়ে মার্কিন বলয়ে অন্ধভাবে প্রবেশ করা হবে ইতিহাসের আরেকটি আত্মঘাতী ভুল।একজন শাসকের পতন ঘটিয়ে অন্য কোনো পরাশক্তির সামরিক বা কৌশলগত স্বার্থের কাছে দেশকে সঁপে দেওয়া জাতীয় মুক্তি হতে পারে না।
কোনো বিদেশি রাষ্ট্র — তা ভারত হোক কিংবা আমেরিকা — ফ্রি সার্ভিস কেউই দেয় না। মার্কিন কূটনৈতিক সমর্থনের পেছনে যদি সেন্ট মার্টিন বা বঙ্গোপসাগরে তাদের সামরিক বা কৌশলগত আধিপত্যের সুদূরপ্রসারী নকশা থাকে, তবে তা বাংলাদেশের ভৌগোলিক নিরাপত্তার জন্য ভারতের আধিপত্যের চেয়ে কোনো অংশে কম ঝুঁকিপূর্ণ নয়।
আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে খুব পরিষ্কার একটি সত্য গ্রহণ করতে হবে: ভারতের গোলামি যেমন অমর্যাদাকর, আমেরিকার তাঁবেদারিও ততটাই বিপজ্জনক।
তাই আমাদের কিছু বিষয়ে এখনই স্পষ্ট হওয়া উচিত যেমন,
১. সামরিক ঘাঁটির বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান: বঙ্গোপসাগর বা বাংলাদেশের কোনো ভূখণ্ডে কোনো বিদেশি শক্তিকে সামরিক ঘাঁটি, কৌশলগত সুবিধা বা অনুকূল নিরাপত্তা চুক্তি করতে দেওয়া যাবে না। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে এটি হতে হবে আমাদের চূড়ান্ত ‘রেড লাইন’।
২. ভারসাম্যপূর্ণ নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি: বাংলাদেশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত কিংবা রাশিয়া — সকলের সাথে সমান দূরত্ব বজায় রেখে নিজের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ আদায় করতে হবে।
৩. অভ্যন্তরীণ রাজনীতির স্বাবলম্বিতা: বিদেশি কোনো দূতাবাস বা পরাশক্তি যেন বাংলাদেশের ক্ষমতার ট্রাস্টি না হতে পারে। এ দেশের সরকার কে পরিচালনা করবে, তা নির্ধারণ করবে কেবল এ দেশের জনগণ ও অবাধ নির্বাচন।
৭১ এর ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত আর ২৪ এর দেড় হাজার তাজা প্রাণের মূল্য কোনো বিদেশি শক্তির ‘ভূ-রাজনৈতিক চালচিত্রের’ (Geo-political chess board) ঘুঁটি হওয়ার জন্য দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ কোনো দেশের ত্রিশতম অঙ্গরাজ্য হওয়ার জন্য স্বাধীন হয়নি, কিংবা মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নের আখড়াও হতে চায় না।
আজ এই ৫ আগস্টে আমাদের একটাই অঙ্গীকার হওয়া উচিত — বাংলাদেশ হবে কেবলই ‘বাংলাদেশপন্থী’। বাহ্যিক শক্তির সহায়তার প্রতি কৃতজ্ঞতা বা কূটনৈতিক সম্পর্ক এক জিনিস, আর নিজ দেশের মাটি ও নীতি তাদের হাতে বিক্রি করে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। এ দেশের জনগণ আর কোনো প্রভূ দেখতে চায় না; তারা দেখতে চায় একটি স্বাবলম্বী, মর্যাদাশীল ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।